কাবা মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রে অবস্থিত এই ঘরকে ঘিরে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। হজ ও ওমরার সময় লাখো মুসল্লি এখানে তাওয়াফ করেন। তবে এই পবিত্র স্থানও যুগে যুগে রক্তাক্ত হামলা, অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়েছে। যদিও মক্কা ছিল হারাম এলাকা, এই হারাম এলাকার গণ্ডির ভেতর যুদ্ধ ও রক্তপাত ছিল নিষিদ্ধ। তবুও ইতিহাস বারবার এই পবিত্রতার সীমা ভেঙেছে। সেসব ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক।
সাল ৬০৫ খ্রিস্টাব্দ। সে সময় আগুনে কাবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কুরাইশদের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। মহানবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে সেই বিরোধ মিটিয়ে দেন। নিজ হাতে পাথরটি যথাস্থানে স্থাপন করেন। আজও রূপালি ফ্রেমে আবদ্ধ সেই পাথর কাবার এক কোণে রয়েছে।
ঠিক ৮২ বছর পর ৬৮৩ সালে মক্কা অবরোধ করে উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের বাহিনী। অবরোধ চলাকালে কাবা আবারও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে আল্লাহর নবীর সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) কাবা নতুন করে নির্মাণ করেন। তিনি কাবার সঙ্গে হাতিম অংশ যুক্ত করেন, যা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মূল নির্মাণের কাছাকাছি ছিল। তবে পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আবার মক্কা অবরোধ করেন। ইবনে জুবাইর (রা.) শহীদ হন এবং কাবা পুনরায় কুরাইশদের পূর্বের আকৃতিতে ফিরিয়ে আনা হয়।
কাবার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয় ৯৩০ সালে। কার্মাতি নামে এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হজের সময় মক্কায় হামলা চালায়। এই হামলায় অসংখ্য হাজিকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা। অনেকের মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় জমজম কূপে। তারা হাজরে আসওয়াদ খুলে নিয়ে যায় এবং ২৩ বছর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরে পাথরটি ফিরিয়ে দেওয়া হলেও সেটি কয়েক টুকরোয় ভেঙে গিয়েছিল। আজও রূপার বন্ধনী দিয়ে সেই টুকরোগুলো সংরক্ষিত আছে।
১৬২৯ সালে ভয়াবহ বন্যায় কাবার দেয়াল ধসে পড়ে। পরে উসমানি সুলতান চতুর্থ মুরাদের আমলে গ্রানাইট পাথর দিয়ে কাবা পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কাবার মূল কাঠামো সেই নির্মাণের ধারাবাহিকতা বহন করছে।
আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর। জুহাইমান আল-ওতাইবি তার শ্যালক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানিকে ‘ইমাম মাহদি’ ঘোষণা করে প্রায় ৪০০-৫০০ সশস্ত্র অনুসারী নিয়ে ফজরের নামাজের সময় মসজিদুল হারাম দখল করে। তারা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্য আগে থেকেই মসজিদের নিচের কক্ষে লুকিয়ে রেখেছিল।
সন্ত্রাসীরা গেট বন্ধ করে দেয়, পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে এবং মিনারে স্নাইপার মোতায়েন করে। পরে সৌদি সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড এবং পাকিস্তানের বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় প্রায় দুই সপ্তাহের অভিযানে হারাম শরিফ পুনর্দখল করা হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ ঘটনায় ২৫৫ জন নিহত ও ৫৬০ জন আহত হন। এরপর সৌদি আরব নিরাপত্তা ও ধর্মীয় নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
কাবা শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। ইতিহাস দেখায়, রাজনৈতিক সংঘাত ও চরমপন্থা বহুবার এই পবিত্র স্থানে রক্ত ঝরিয়েছে। তবু শত আঘাত পেরিয়ে কাবা আজও কোটি কোটি মুসলমানের ইবাদত, ভালোবাসা ও একত্ববাদের কেন্দ্র হয়ে আছে।
সময়ের আলো/এসএকে