ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ দ্রুত গঠন এবং এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া শেয়ারগুলো আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের উদ্দেশ্যে এই স্মারকলিপি জমা দেন ফোরামের সদস্যরা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের অতীতের সুনাম ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অবিলম্বে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ, লুণ্ঠিত অর্থ পুনরুদ্ধার, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক নূর নবী মানিক স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে এস আলমের ঘনিষ্ঠ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগ এবং জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক আমানতকারী তাদের অর্থ নিরাপদ নয় মনে করে বিভিন্ন শাখা থেকে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। এতে নগদ অর্থ সংকটও দেখা দিয়েছে বলে দাবি করা হয়।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়।
ফোরামের দাবি, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ব্যাংকের মালিকানা নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অনিয়ম, বেনামি ঋণ ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাংকের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়। এসব প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
তারা দাবি করে, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এবং প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার আমানত বৃদ্ধি পায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের পর্ষদ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপে গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদ বাতিল করে একজন ব্যক্তির হাতে পুরো ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মাধ্যমে নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
সংগঠনটি ছয় দফা দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—
অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন।
২০১৭ সালে হারানো মালিকানা প্রকৃত ও আদি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আতঙ্ক ও অপপ্রচার বন্ধ করে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করা এবং দায়ীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮/ক ধারা সংশোধন করে চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ করা।
এছাড়া জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, আস্থা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। তাই দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণারও হুঁশিয়ারি দেয় সংগঠনটি।
উল্লেখ্য, গত ১ জুন থেকে সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম আন্দোলন শুরু করে। পরে ১৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ পুরো পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং ব্যাংকের সার্বিক দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনের ওপর ন্যস্ত করে।
/ইউএমএইচ