জাতীয় সংসদে ‘বগলদাবা’ কিংবা সংঘাতমুখী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন না বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি হলে (লেজিসলেটিভ মেম্বারস ক্লাব) আয়োজিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বিরোধী দলের উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহেরসহ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় সংসদীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান অতীতের সংসদীয় রাজনীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে প্রধানত দুই ধরনের বিরোধী দল দেখা গেছে। যার একটি ধারা ছিল সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বা গৃহপালিত এবং অন্য ধারাটি সংসদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দীর্ঘ সময় সংসদ বর্জন করে রাখত। জামায়াতে ইসলামী এই দুই ধারার কোনোটিই অনুসরণ করবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের বগলদাবা বিরোধী দল হবো না, আবার এমন কোনো দায়িত্বহীন আচরণও করব না যাতে জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। সংসদে আমাদের অবস্থান প্রথম দিন থেকেই সুনির্দিষ্ট এবং তা হলো—‘উই উইল বি রিজনেবল অ্যান্ড লজিক্যাল’।’
বিরোধী দলীয় নেতা জানান, চলতি অধিবেশনে জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে সংসদে নোটিশ দিয়েছেন। এর মধ্যে গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাতের চরম সংকট, প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা এবং সীমান্ত এলাকায় ‘পুশ-ইন’ ইস্যু অন্যতম। প্রবাসীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে একটি সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার এখনো এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সীমান্তে পুশ-ইন ইস্যুটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল আখ্যা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্পর্শকাতরতার অজুহাতে সংসদীয় নোটিশটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হলেও জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কার্যসূচি থেকে এটি প্রথমে বাদ দেওয়া হলেও তারা বিষয়টি নিয়ে সংসদে জরুরি আলোচনার জোর দাবি জানান।
চলতি বাজেট অধিবেশন এবং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী মার্চ মাসে সম্পূরক বাজেট পেশ করার কথা থাকলেও তা জুনের মাঝামাঝি সময়ে এসে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে তড়িঘড়ি করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয়ের ফলে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
বর্ষাকালে তাড়াহুড়ো করে উন্নয়ন কাজ করার সমালোচনা করে তিনি দেশের ফিসকাল ইয়ার বা অর্থবছর বর্তমানের ‘জুলাই-জুন’ চক্রের পরিবর্তে ‘জানুয়ারি-ডিসেম্বর’ করার প্রস্তাব দেন। এটা বাস্তবায়ন করলে উন্নয়ন কাজে গুণগত মান ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অধিক কার্যকারিতা আসবে বলে তিনি মনে করেন।
সংসদীয় আচরণ কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, দলীয় চরিত্রহনন কিংবা সরকারের অযথা তোষামোদি বা স্তুতি গেয়ে সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত নয়। তারা সংসদে কারও প্রশংসা করতে আসেননি, বরং জনগণের প্রকৃত দাবি তুলে ধরতেই এসেছেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংসদকে ‘আপোসের সংসদ’ বা ‘মিলমিশের সংসদ’ আখ্যা দেওয়ার ধারণা নাকচ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যৌক্তিক ও জনকল্যাণমুখী বিষয়ে সরকারকে সমর্থন দেওয়া এবং একই সঙ্গে ভুল নীতির কঠোর সমালোচনা করাই একটি কার্যকর বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব।
কোনো যৌক্তিক বিষয়ে বিরোধী দলের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হলে তারা প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে সংসদ বর্জনের মতো নেতিবাচক পথ তারা বেছে নেবেন না।
এছাড়া সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি জানান, জামায়াত আমূল পরিবর্তনের চেয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে এবং এই লক্ষ্যে কোনো সংস্কার কমিটি গঠনের প্রস্তাব এলে তারা তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবেন।
সময়ের আলো/জেডি