সাইপ্রাসের পর সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলমের সম্পদ ক্রোকের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাতীয়

কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল

2026-06-16T19:32:57+00:00
2026-06-16T19:44:20+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
জাতীয়
দ্য এজ মালয়েশিয়ার প্রতিবেদন
সাইপ্রাসের পর সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলমের সম্পদ ক্রোকের শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পিএম  আপডেট: ১৬.০৬.২০২৬ ৭:৪৪ পিএম  (ভিজিট : ৩৩)
ছবি : সংগৃহীত
কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের (এস আলম) আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যের ওপর চতুর্মুখী জাল ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত তার বহু বিলিয়ন ডলারের অবৈধ সম্পদের খোঁজে এবার কুয়ালালামপুরের দুটি বিলাসবহুল ফাইভ স্টার হোটেলের দিকে নজর পড়েছে তদন্তকারীদের। একই সাথে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর জুড়ে তার ছায়া কোম্পানির মাধ্যমে গড়ে তোলা অর্থ পাচারের এক বিশাল নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য এজ মালয়েশিয়া’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে এস আলম ও তার পরিবার পলাতক রয়েছেন এবং তারা বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাইপ্রাসের একটি আদালত এস আলম ও তার স্ত্রীর একটি বিলাসবহুল বাড়ি ক্রোক করেছে এবং চট্টগ্রামের একটি ঋণ আদালত তাদের অনুপস্থিতিতে পাঁচ মাসের দেওয়ানি কারাদণ্ড দিয়েছেন। এর পরপরই মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘রেনেসাঁ হোটেল’ এবং ‘ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন’ হোটেল দুটির সাথে এস আলমের মালিকানার যোগসূত্র মেলায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

কুয়ালালামপুরের বিলিয়ন রিঙ্গিতের হোটেল ব্যবসা
কুয়ালালামপুরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকা ‘জ্যালান সুলতান ইসমাইল’ এবং ‘জ্যালান আমপাং’-এর মোড়ে অবস্থিত এই দুটি সুপরিচিত হোটেল। ২০১৬ সালে আইজিবি কর্পোরেশন নামক একটি মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে (তৎকালীন মূল্যে) হোটেল দুটি কিনে নেয় ‘ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনাল’ (পূর্বনাম কানালি লজিস্টিকস) নামক একটি প্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ‘ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনাল’ মূলত সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ‘ওয়াইআইএফ হোল্ডিং’ এবং একটি শক্তিশালী এশিয়ান গ্রোথ ফান্ডের আড়ালে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অভিযোগ করেছে, এস আলম সিঙ্গাপুরে ‘কানালি লজিস্টিকস’ নামের যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই একই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে মালয়েশিয়ার এই হোটেল সাম্রাজ্য কেনা হয়। বর্তমানে ৯১৯ কক্ষবিশিষ্ট এই দুটি হোটেলের আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত (বাংলাদেশি মুদ্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা)। সাইপ্রাস ও সিঙ্গাপুরের পর এবার মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলমের এই বিপুল সম্পদও ক্রোকের আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরে বিলিয়ন ডলারের ‘ভুতুড়ে’ সাম্রাজ্য
২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নেওয়া এস আলমের অফশোর হোল্ডিংয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমতি ছাড়াই দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচার করে তিনি সিঙ্গাপুরে অন্তত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৩২৮ কক্ষের ‘হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর’, লিটল ইন্ডিয়ার বিশাল বাণিজ্যিক স্পেস এবং ‘আইবিস নোভেনা’ হোটেল।

গত বছরের জুলাই মাসে ঢাকা আদালত এস আলম ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সিঙ্গাপুরের আটটি কোম্পানির শেয়ার এবং ডজনখানেক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন। সিঙ্গাপুরের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের কাছে এস আলম গ্রুপের যাবতীয় পাচারকৃত সম্পদের বিবরণ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। সিআইডির প্রাথমিক হিসাব মতে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম কেবল সিঙ্গাপুরেই ১২.৮৯ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন।

নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সাঁড়াশি অভিযান
আইনি জটিলতা ও ট্রাইব্যুনাল থেকে বাঁচতে এস আলম এবং তার পরিবার ইতিমধ্যে দুইবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন বা বাতিলের জন্য আবেদন করেছেন। তবে বাংলাদেশের হাইকোর্ট এই আবেদন প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এস আলমকে নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমতি দিলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দেশের ভেতরের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা) অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। যার একটি বড় অংশই গেছে এস আলম গ্রুপের পকেটে।

মালয়েশিয়ায় সফরে আসছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী 
এস আলমের এই সম্পদ কেলেঙ্কারির মধ্যেই মালয়েশিয়ায় এক অভিনব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়াকে। আগামী ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরেই এমন একটি দেশে যাওয়া, যেখানে এস আলমের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ (মারিয়ট ব্র্যান্ডের দুটি হোটেল) রয়েছে— তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বৈঠকে ঢাকা-কুয়ালালামপুর শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং মালয়েশিয়ায় নাগরিকত্ব নেওয়া ‘বেস্টিনেট’ নামক বিতর্কিত মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা (বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত) আমিনুল ইসলাম এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনের প্রত্যর্পণ ইস্যুটিও জোরালোভাবে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক সময় বাংলাদেশের পাঁচটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, বিশাল শিল্প গ্রুপ আর কুয়ালালামপুর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একচ্ছত্র হোটেল সাম্রাজ্যের অধিপতি সাইফুল আলমের পায়ের তলা থেকে মাটি এখন দ্রুতই সরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর গলে সিঙ্গাপুরের আইনজীবীদের মাধ্যমে একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে দাবি করলেও, বৈশ্বিক এই সাঁড়াশি অভিযানের মুখে এস আলমের দুনিয়া ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।

/কহু


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: