ছেলে বিদেশে যাবে, ঘোচাবে সংসারের অভাব, পেট ভরে ভাত খাবে পরিবারের সবাই, নতুন ঘর উঠবে, ছেলে ফিরলে তাকে বিয়ে দিয়ে ঘরে আনা হবে নতুন বৌ- এ রকম দুই চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে অনেক পরিবারই ছেলেকে বিদায় জানায়। এর আগে পরিবারের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। কিন্তু সবার সেই স্বপ্ন পূরণ হয় না। স্বপ্ন পূরণের সে পথ আদতে হয়ে ওঠে মৃত্যুযাত্রা। যে দুমুঠো অন্নের আশায় ভিটে-মাটি বিক্রি করে আপনজন সাগরপথে পাড়ি জমায় ইউরোপের পথে, অনেকে সেই খাবারের অভাবেই ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। লাশ হয়ে ভেসে বেড়ায় নীল সাগরে।
প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি সাগরপথে বিদেশ যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মারা যায়। অনেককে বিদেশে আটকে রেখে দেশ থেকে আদায় করা হয় মুক্তিপণ। কিন্তু তারপরও থামে না এই ভয়ংকর যাত্রা। আর প্রকৃত অপরাধীরা বরাবরই থেকে যায় রহস্যের অন্ধকারে। সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে মানব পাচারের ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলাদেশিরা শীর্ষ তালিকায় অবস্থান করছেন।
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম আফ্রিকার রুট দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় প্রতি বছর হাজার হাজার অভিবাসী প্রাণ হারান। এর মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ রয়েছে।
অবৈধভাবে সাগরপথে বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপ ও মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে প্রতি বছর কত সংখ্যক বাংলাদেশি প্রাণ হারায় তার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এই বছরে এ সংখ্যা অর্ধ সহস্রাধিক। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্যমতে, প্রকৃত সংখ্যা ও নিখোঁজের হার আরও অনেক বেশি।
আইওএম দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করে, যাদের মধ্যে ৮৯০ জনেরও বেশি প্রাণ হারায়। বিশেষ করে আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে ২০২৪ সালে মারা যান ৫৯৮ জন এবং ২০২৫ সালে মারা যান ৮৬০ জন। এক বছরে মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যা ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আন্দামান সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকসহ প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ হয় বলে জানায় জাতিসংঘ। গত ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এ তথ্য জানায়। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজ গত ৯ এপ্রিল সাগর থেকে ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করে, যার মধ্যে একজন নারীও ছিলেন।
কোস্ট গার্ডের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ভাসমান ড্রাম ও কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে থাকা কয়েকজনকে গভীর সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে সাগরপথে বিদেশ যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে অনাহার, তৃষ্ণা ও দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে প্রাণ হারান ১৮ জন বাংলাদেশি।
জানা যায় ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর অঞ্চলের তরুণরা সাধারণত এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথে বেশি পাড়ি জমান। সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যুর পাশাপাশি এসব রুটে মানব পাচারকারী চক্রের হাতে অপহরণ ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হওয়ার হারও অনেক বেশি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের কাউকে কাউকে মাঝেমধ্যে গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতারা সবসময়ই রয়ে যায় আড়ালে। আবার গ্রেফতারের পর অনেক সময় যথাযথ সাক্ষী না পাওয়া, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বাদীকে হুমকি-ধমকি কিংবা আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে মামলা আর শেষ পরিণতি পায় না।
নৌপথে বিদেশ যাওয়ার ভয়ংকর যাত্রায় দুর্ঘটনার পর ফিরে আসাদের অনেকে জানায় তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা, যা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো ১৮ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় অপরাধী তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম (৫২)। সিআইডির টিএইচবি (মানব পাচার প্রতিরোধ) ইউনিট গত ১৫ জুন সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভূমধ্যসাগরে নিহতদের একজন ভুক্তভোগী মাসুম (ছদ্মনাম) ও গ্রেফতার অভিযুক্ত মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপ যাত্রার বিপজ্জনক পথে পা বাড়ান।
মানব পাচার চক্রটি ইউরোপের দেশ গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাসুমের পরিবারের কাছে মোট ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিমানযোগে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেয়। উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সদস্যরা দালাল চক্রের কথায় বিশ্বাস করে মাসুমের পরিবার এ অর্থ পরিশোধে সম্মত হন।
ঢাকায় ১৭ দিন থাকার পর চক্রের সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে মাসুমকেও লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর মাসুম পরিবারকে ফোনে এই চক্রের এক সদস্যকে টাকা পাঠানোর নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক একটি ব্যাংক হিসাবে গত জানুয়ারি মাসে ৪ লাখ টাকা জমা করেন মাসুমের পিতা। কয়েক দিন পর গ্রেফতার অভিযুক্ত মিকাইল মিয়ার কাছে নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে নিভে যায় তার জীবন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ৬ দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে মৃত্যু হয় বেশ কয়েকজনের। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝ সমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে উদ্ধার হওয়া জীবিত ব্যক্তিরা জানান।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে কয়েক মাস অবস্থানের পর গত ২১ মার্চ ১৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি কয়েক দিন ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। অবশেষে অনাহার ও পানিশূন্যতায় প্রাণ হারান একাধিক ব্যক্তি, যাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। কয়েক দিন লাশগুলো নৌকাতে রাখার পর সেগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে তা ফেলে দেওয়া হয় সাগরে। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে যে মৃতদের মধ্যে তাদের মাসুমও রয়েছেন। গ্রিসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা গ্রহণ করা হয়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার করা হয় মিকাইল ইসলামকে। এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) জসীম উদ্দিন খান বলেন, সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধু সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনসাধারণকে পরামর্শ প্রদান করছে। একই সঙ্গে মানব পাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান কিংবা এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডিকে অবহিত করার জন্যও অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এএডি