২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতি বছর অন্তত ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে দাবি করেছে পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।
তাদের অভিযোগ, আগামী অর্থবছরের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৩৭৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ২ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৮ শতাংশ বরাদ্দই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর খাতে যাচ্ছে।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাত : নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন তারা।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। সহযোগী হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী।
সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা জাতীয় বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের ঘোষণাকে স্বাগত জানান। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যয় ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।
তবে তারা অভিযোগ করেন, বাজেট ঘোষণার কয়েক দিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা সাধারণ গ্রাহক, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাদের মতে, এতে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেলেও সাধারণ ব্যবহারকারীরা কর-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী ও বিডব্লিউজিইডির সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব কর-সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে।
বেলার প্রতিনিধি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট ও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনাও থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে বিদ্যমান জ্বালানি বৈষম্য দূর করতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ক্লিনের নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার। যত দ্রুত আমরা এগোবো, অর্থনীতি তত লাভবান হবে। তাই এই খাতে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, একটি বাজেট তখনই মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। বৈষম্য রেখে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে সরকারকে কার্যকর প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণে বাজেট ও নীতির যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ুকর্মী ফারাহ আনজুম বলেন, বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিতে যাচ্ছে।
তা হলে প্রশ্ন হলো, আমাদের নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে কি কোনো সামঞ্জস্য রয়েছে? সংবাদ সম্মেলন থেকে ৭ দফা কৌশলগত দাবি উত্থাপন করা হয়-
১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৮ জুন ২০২৬ জারিকৃত এসআরও বাতিল করে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক ও কর আগামী ১০ বছরের জন্য বাতিল করতে হবে- যা সবার জন্য প্রযোজ্য হবে।
২. বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন করতে হবে যা বাংলাদেশ ব্যাংক বিনাসুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোক্তাদের দেবে। এ ক্ষেত্রে পুনঃতহবিল নয় বরং পূর্ব তহবিল সরবরাহ করতে হবে।
৩. নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে বাজেটে আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা (২০০ মার্কিন ডলার) সরাসরি ভর্তুকি বরাদ্দ করতে হবে। বৈষম্য দূর করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।
৪. শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে অবিলম্বে করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির নির্দেশিকা সক্রিয় করতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক হুইলিং চার্জ চালু করতে হবে, যাতে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
৫. নতুন অনুমোদিত সব ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পের সঙ্গে ন্যূনতম ২০ শতাংশ ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে।
৬. স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর দশ লাখ পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন, মহিলাবিষয়ক অধিদফতর, সমবায় অধিদফতর ও জনশক্তি বিভাগের উদ্যোগে নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে উচ্চ দক্ষতার কাজে বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
৭. দূষণকারীদের নিরুৎসাহিত করতে এবং সবুজ ব্যবসা উদ্যোগে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দূষণকারী শিল্প-কারখানার ওপর প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপ করতে হবে।
সময়ের আলো/জেডি