ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আক্রমণের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বন্ধে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতির হার। বাংলাদেশেও এর প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বাজারে টাকার অতিরিক্ত সরবরাহ বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই ধারাবাহিকতায় ওপেন মার্কেট অপারেশনের (ওএমও) আওতায় মাত্র একদিনেই ব্যাংকিং খাত থেকে নিট ৪ হাজার ৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য তুলে (অ্যাবজর্ভ) নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে এই অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে।
রোববার (২১ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো এ তথ্য হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একই দিনে দেশের ব্যাংকিং খাতের দুই ধারায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। একদিকে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের অলস টাকা বাজারে বিনিয়োগ না করে নিরাপদ মুনাফার আশায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রেখেছে, অন্যদিকে তীব্র তারল্য সংকটে থাকা ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন করে টাকা ধার করেছে।
অলস টাকা জমা রেখেছে সাধারণ ব্যাংকগুলো :
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মূলধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত অলস তহবিল থাকায় তারা ১ দিন মেয়াদি ‘স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি’ (এসডিএফ)-এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা দেয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৯ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসে এবং দিন শেষে ৫ হাজার ৪২২ কোটি ১১ লাখ টাকার ম্যাচিউরিটি বা সমন্বয় শেষে নিট ৪ হাজার ৯০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বাজার থেকে উঠে যায়।
বর্তমানে এ তহবিলের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ নীতি সুদ দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা রাখাকে ব্যাংকগুলো এখন বেশি নিরাপদ মনে করছে।
তহবিল সংকটে ইসলামী ব্যাংকগুলোর নতুন ধার :
অন্যান্য ব্যাংক যখন টাকা জমা রাখছে তখন শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর চিত্র ভিন্ন। তারল্য সংকট সামাল দিতে ইসলামী ব্যাংকগুলো ৭ দিন মেয়াদি ‘ইসলামী ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি’ (আইবিএলএফ)-এর শরণাপন্ন হয়। এই সুবিধার আওতায় তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৭৩০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নতুন করে ধার নেয়।
পূর্বের ৬৯৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ম্যাচিউরিটি বাদ দিয়ে ওই দিন ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাজারে নিট ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা নতুন করে প্রবেশ (ইনজেক্ট) করে। এ বিশেষ তহবিলের ক্ষেত্রে প্রফিট শেয়ারিং রেশিও (পিএসআর) ও এক্সপেক্টেড প্রফিট রেট (ইপিআর) অনুযায়ী ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ মুনাফা হার নির্ধারিত রয়েছে।
দিনশেষে নিট তারল্য শোষণ ৪ হাজার কোটি টাকা :
ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাজারে ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা নতুন করে ঢুকলেও, এসডিএফের মাধ্যমে অন্য ব্যাংকগুলো থেকে ৪ হাজার ৯০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে আসায় সামগ্রিক বাজার থেকে নিট তারল্য শোষণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ বর্তমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির (কন্ট্রাকশোনারি মনিটারি পলিসি) সাথে সংগতিপূর্ণ। বাজার থেকে এই বিশাল পরিমাণ টাকা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার ফলে বাজারে টাকার তারল্য কমবে, যা চলমান মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকগুলোর লাগাতার ধার করার প্রবণতা এ খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও তারল্য সংকটকে আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাসের শঙ্কা নিয়ে যা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক :
ওএমও সিস্টেমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশের মানুষকে স্বস্তি দিতে যা যা দরকার বাংলাদেশ ব্যাংক তা-ই করবে।’
এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রাখা ঝুঁকিহীন হওয়ায় বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কমার আশঙ্কা আছে কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেন কোনো বাধা না থাকে সে জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বাজারে রাখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে এখনও কোনো অভিযোগ আসেনি যে, বেসরকারি খাত টাকা পাচ্ছে না। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের সুরক্ষায় যদি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে আস্থা না পায়, সে ক্ষেত্রে আমাদের বলার কিছু থাকে না। এটা ব্যাংকের বিজনেস পলিসি। এখন তারা বেসরকারি খাতে ক্রেডিট কম করছে। কিন্তু একসময় তারা ক্রেডিট লিমিট ভেঙে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করেছে।
সময়ের আলো/জেডি