বিনিয়োগে সাড়া নেই দেশের উদ্যোক্তাদের। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছর থেকে যে বিনিয়োগ খরা শুরু হয়েছিল, তা এখনও কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর তো একেবারেই হাত গুটিয়ে বসেছিলেন দেশের উদ্যোক্তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গত দেড়-দুই বছরও বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সাহস পাননি। অপেক্ষায় ছিলেন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে বিনিয়োগের ডালা খুলবেন তারা। নতুন সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার ছয় মাস হতে চলল, কিন্তু দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি নেই। ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা পড়ে আছে, কিন্তু বিনিয়োগ নেই।
বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে আছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ টাকা আছে তবু সাহস পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এ জন্য বিনিয়োগ খরাও কাটছে না দেশে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চাচ্ছে কিন্তু উদ্যোক্তারা নিতে চাচ্ছেন না।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগমুখী না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ মূলত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও এখনও উদ্যোক্তারা ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ করছেন। তারা বলছেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আরও কিছুটা স্থিতিশীল হলে তবেই তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
উদ্যোক্তারা আরও জানান, বিনিয়োগমুখী না হওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ আছে। যেমন দেশের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটও বিনিয়োগকারীদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিচ্ছে। এ ছাড়া ডলার সংকট, সুদের হার বৃদ্ধি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও নীতির অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে হাত দিচ্ছেন না। আর বিনিয়োগ না বাড়ায় হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থান, কাটছে না বেকারত্ব এবং সচল হচ্ছে না অর্থনীতির চাকা। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পূর্ণ অনুকূলে না আসা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবেন না।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘গত চার-পাঁচ বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ রীতিমতো থমকে আছে। দেশি বিনিয়োগ যেমন নেই, বিদেশি বিনিয়োগেও গতি নেই। অথচ দেশের ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ করার মতো টাকা অলস পড়ে আছে। সরকারও প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নন। কারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছেন। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে আস্থার অভাব এখনও প্রকট। আসলে টাকা থাকলেই বিনিয়োগ হয় না, দরকার আস্থা।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে নতুন কারখানা হচ্ছে না, পুরোনো কারখানার সম্প্রসারণও বন্ধ। ফলে তরুণদের চাকরির দরজাও বন্ধ। ব্যাংকে টাকা পড়ে আছে, কিন্তু উদ্যোক্তারা সাহস পাচ্ছেন না। বিনিয়োগের এই খরা কাটাতে না পারলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। কারণ একদিকে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, অন্যদিকে অনেক চলমান কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কারখানার মালিকরা শত শত শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। সুতরাং একদিকে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না, অন্যদিকে চলমান কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বেকারত্ব না কমে আরও বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। এর ফলে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন আছে, তেমনই সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে। তাই নতুন সরকারের উচিত বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং দ্রুত দেশের উদ্যোক্তাদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনা।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে গেলে তো বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ লাগবে। হ্যাঁ, দেশে নতুন সরকার মাত্র এসেছে। সরকার এসেই অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সংকট আরও বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট চলছে। এতে করে চলমান কারখানাগুলো চালু রাখতেই ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই এই অবস্থার মধ্যে নতুন করে বিনিয়োগ করা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন উদ্যোক্তারা।’
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ আরও বলেন, ‘অনেকেই আশায় ছিলেন, দেশে নির্বাচিত সরকার এলে হয়তো বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে নতুন সরকার হুট করেই তো আর বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে পারবে না। তা ছাড়া নতুন সরকার আসার পর সরকারের পলিসি কেমন হবে, এনবিআর রিফর্ম কীভাবে কতটা হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি কতটা হচ্ছে বা হবে, গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকার কি ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে- এসব অনেক কিছু বিষয় দেখার আছে।
তবে বিএনপি সরকারের একটা ভালো দিক- সরকারপ্রধান ব্যবসায়ীদের কথা শুনছেন, ডেকে ডেকে বসছেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো শুনছেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। তাই আমরা আশা করছি- এ বছরের মধ্যেই সরকারের প্ল্যান অব অ্যাকশন পরিষ্কার হয়ে যাবে, সরকারের পরিকল্পনাগুলো উদ্যোক্তাদের কাছে আরও স্বচ্ছ হলে তখন তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। সুতরাং আমি মনে করি বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হতে আরও চার-পাঁচ মাস সময় লাগবে।’
আরেক উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে এহসান শামীম সময়ের আলোকে বলেন, ‘দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে কীভাবে- বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে এখন আমাদের। আমরা না পারছি বেশি করে সুতা কেনার সাহস, কারণ সুতা কিনে পোশাক বানিয়ে যদি বিক্রি করতে না পারি। আবার না পারছি মেশিনারিজ আমদানি করতে। নতুন মেশিনারিজ আমদানি করতে না পারলে নতুন কারখানা কীভাবে গড়ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ নানা রকম সংকটের কারণেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। দেশে নতুন সরকার এসেছে, কিন্তু সরকার এখন কি করবে- যুদ্ধের কারণে অনেক কিছুই করা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সংকট প্রকট হয়েছে। এখন আবার গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকার হয়তো চেষ্টা করছে, কিন্তু বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি হতে আরও সময় লাগবে বলে আমার মনে হয়।’
বিনিয়োগ পরিস্থিতি : ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দিতে চায় এবং সরকারও প্রণোদনা দিচ্ছে- কিন্তু উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন না। কারণ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আস্থা নেই। এলসি জটিলতা, কাঁচামালের দাম ও ১২ থেকে ১৫ শতাংশ সুদের চাপে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এটি অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা। দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের চাকা ঘুরছে না বললেই চলে। ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও নতুন শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সাড়া মিলছে না উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, তফসিলি ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে ১.৮ থেকে ২ লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কমেছে। বিনিয়োগ বোর্ড-বিডায় নতুন শিল্প নিবন্ধনও ৩০ শতাংশ কমেছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, টাকা থাকলেও ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করার মতো পরিবেশ নেই। বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে উচ্চ সুদ হার, ব্যাংক ঋণের সুদ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। এত বেশি খরচে ব্যবসা করে লাভ তোলা কঠিন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া ডলার ও আমদানি সংকট, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খুলতে দেরি ও বেশি দাম। এ ছাড়া নীতি অনিশ্চয়তা, কর, শুল্ক ও নিয়মের ঘন ঘন পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যাচ্ছে না। এসব কারণে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত খাতের অনেক কোম্পানি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। গত টানা তিন বছর ধরে কমছে সরকারি বিনিয়োগ, যা এখন জিডিপির ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিনিয়োগ শুধু টাকার বিষয় না। এটি আস্থার বিষয়। যতদিন না বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি, ডলার, মুদ্রাস্ফীতি ও নীতি স্থিতিশীল হবে, ততদিন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে ফিরবে না। তাই দ্রুত বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা দরকার।’
মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির চিত্র নাজুক : বর্তমানে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির চিত্র খুবই নাজুক। এটি সরাসরি বোঝায় যে নতুন কারখানা-সম্প্রসারণে বিনিয়োগ কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২৫ শতাংশ কমেছে। আর গত বছরের ডিসেম্বরের হিসাবে ৪৫ শতাংশ কমেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমা মানে নতুন কারখানা না হওয়া, উদ্যোক্তারা নতুন মেশিন কিনে উৎপাদন বাড়াচ্ছেন না বা সম্প্রসারণ বন্ধ, বিদ্যমান শিল্পও ক্যাপাসিটি বাড়াচ্ছে না, বিনিয়োগের আস্থা কম। উচ্চ সুদ, ডলার সংকট ও নীতি অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যাচ্ছেন না।
ঢাকা চেম্বারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ঋণের সুদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রার অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক বিলম্বে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীরাই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। শুধু যন্ত্রপাতি না, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১.৪ শতাংশ কমেছে, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমেছে ২.৩ শতাংশ। অর্থাৎ উৎপাদনের পুরো চেইনই ধীর হয়ে গেছে।
সময়ের আলো/এসএকে