বহর বাড়ছে বিমানের, শঙ্কা মুনাফা নিয়ে

রফিক রাফি

অর্থনীতি

বহর সম্প্রসারণের বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর অংশ হিসেবে গত বুধবার বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন করে ১১টি উড়োজাহাজ

2026-09-25T01:14:19+00:00
2026-09-25T01:14:19+00:00
 
  শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
বহর বাড়ছে বিমানের, শঙ্কা মুনাফা নিয়ে
রফিক রাফি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৪ এএম 
বোয়িং। ছবি : সংগৃহীত
বহর সম্প্রসারণের বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর অংশ হিসেবে গত বুধবার বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন করে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে সংস্থাটি। এর আগে চলতি বছর আরও ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এ ছাড়া এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে বিমানের বহরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এতগুলো বোয়িং উড়োহাজাজ কিনতে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।  এই বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে সক্ষমতা বাড়ালেও বিমান আদৌ বাণিজ্যিকভাবে সফল ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে-কলমে বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এই বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সফল হওয়ার অপার সুযোগ থাকলেও বিমান তা কাজে লাগাতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকারের মুখপাত্র ও বিমানের ভাষ্য, চাহিদা রয়েছে তাই আন্তর্জাতিক রুট বাড়ানো এবং বিদ্যমান রুটে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই একের পর এক নতুন উড়োজাহাজ কেনা।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে।

মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এয়ারবাসের সঙ্গেও প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ চাহিদার ভিত্তিতেই বিমান কিনবে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন সেক্টর সম্প্রসারণ হচ্ছে, নতুন নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন বলেছেন, নতুন সম্পূরক চুক্তি বিমানের বহর আধুনিকায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই এ ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের জনগণ, প্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যোগাযোগের চাহিদা পূরণে বিমানের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে পরিচালন দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যমান বোয়িং বহরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকবে।

রুমী এ হোসেন বলেন, আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই বহর গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগ শক্তিশালী করাই বিমানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন খাতের পরিবর্তন এবং দেশের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে বহর ও নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।

বিমানের তথ্যানুযায়ী, বিমানের নতুন বহর নিয়ে বড় পরিসরের পরিকল্পনার শুরু এয়ারবাসকে ঘিরে। ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা সামনে আসে। এ নিয়ে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা এগোয়। একই সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর বাংলাদেশ সফরেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

২০২৩ সালের ৩ মে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ এয়ারবাসের প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য দুটি কমিটিও গঠন করা হয়। পরে প্রস্তাবটি নিয়ে আরও মূল্যায়ন ও আলোচনা চলে। তবে তখন কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিমানের উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে বোয়িংয়ের প্রস্তাব এগিয়ে যায়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বোয়িংয়ের প্রস্তাব ও সংশোধিত চুক্তির খসড়া পর্যালোচনা করে বিমান। ৩০ ডিসেম্বর বিমানের পরিচালনা পর্ষদ ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়।

বিমানের বর্তমান বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করে বিমান। চুক্তির তালিকামূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ও চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। প্রথম উড়োজাহাজ ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং শেষটি ২০৩৫ সালের অক্টোবরে সরবরাহের কথা। গত বুধবার আরও ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি করায় এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৪ এ। এরপর আরও ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে মোট সংখ্যা ৫৪-তে পৌঁছাতে পারে।

নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানের সক্ষমতা বাড়বে— এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তেমন কোনো প্রশ্ন নেই। তাদের প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি সক্ষমতা কতটা বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দেবে। নতুন উড়োজাহাজ কেনা, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল এবং রুট ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত রাজস্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না সেটিই বিমানের জন্য এখন বড় পরীক্ষা। কারণ সবাই জানে বিমান লোকসানি প্রতিষ্ঠান।

তবে বিমান বলছে, তারা বর্তমানে মুনাফা করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। একই সময়ে পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা এবং মোট আয় ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে ২১টি উড়োজাহাজ দিয়ে ৩০টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ৩৩ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী পরিবহন করে বিমান।

তবে ধারাবাহিক মুনাফার এই প্রবণতা বড় বহর যুক্ত হওয়ার পরও ধরে রাখা যাবে কি না তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ বহর যত বড় হবে, স্থায়ী ও পরিচালন ব্যয়ও তত বাড়বে। নতুন উড়োজাহাজের অর্থায়ন ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, ক্রু, পাইলট, প্রশিক্ষণ, বীমা, বিমানবন্দর ফি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বহন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এয়ারলাইন্সের জন্য উড়োজাহাজ কেনা মূলত ব্যবসার প্রথম ধাপ। আসল সাফল্য নির্ভর করে সেই উড়োজাহাজ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। একটি উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় মাটিতে পড়ে থাকলে সেটি আয় করার পরিবর্তে ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কোনো রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকলে বড় উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলেও প্রত্যাশিত রাজস্ব পাওয়া সম্ভব নয়।

এই জায়গাতেই বিমানের সামনে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বহর বাড়ানোর পর নতুন রুটগুলোতে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারে বড় বড় এয়ারলাইন্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যাত্রী আকর্ষণ করা সহজ হবে না।

বহর সম্প্রসারণের সঙ্গে বিমানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত কারিগরি জনবল প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, যন্ত্রাংশের সরবরাহ, হ্যাঙ্গার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং অন্যান্য অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করতে হবে।

বিমানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে টিকেট বিক্রি ও যাত্রী ব্যবস্থাপনা। অতীতে টিকেট বিক্রি ও সময়ানুবর্তিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও টিকেট বিক্রি ও অন-টাইম পারফরম্যান্সকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। নতুন উড়োজাহাজের সক্ষমতা কাজে লাগাতে হলে শুধু সরাসরি যাত্রী নয়, ট্রানজিট যাত্রী ও কার্গো বাজারকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, ৫৪ বছরে একটি জাতীয় এয়ারলাইন্স উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যাওয়ার কথা থাকলেও বিমান দুর্ভাগ্যবশত তা পারেনি। বাংলাদেশে আকাশপথের যাত্রীর কোনো অভাব নেই, কিন্তু বিমানের কাছ থেকে আশানুরূপ ও বিশ্বস্ত সেবা না পেয়ে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, বিমানের সক্ষমতা ও বহর বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা যাত্রীদের বিমান ভাড়া কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উচ্চ কর, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ এবং মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে টিকেটের দাম এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি।

দেশে ক্রমবর্ধমান বিমানযাত্রী ও আকাশপথের ট্রাফিক বিবেচনায় বিমানের নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তিনি। তবে বড় বহর পরিচালনায় বিমানের বর্তমান পরিকল্পনা, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা যথেষ্ট কি না সে প্রশ্নও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শুধু উড়োজাহাজ কিনলেই হবে না; সেগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা, দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। বিপুল বিনিয়োগের পর নতুন রুটগুলো থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব ও লাভ নিশ্চিত করাই বিমানের বাণিজ্যিক কার্যকারিতার বড় পরীক্ষা হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   বহর  বাংলাদেশ বিমান  বোয়িং  শঙ্কা  মুনাফা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: