ছবি : সংগৃহীত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতে গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের দ্বিতীয় বৈঠক হবে আজ। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মজুরি বোর্ডের সভাকক্ষে বেলা ১১টায় বসবে বৈঠক। গত বুধবারের প্রথম বৈঠক শেষেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয় বৈঠকেই মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষই তাদের মজুরি প্রস্তাব বোর্ডের কাছে জমা দেবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রমিকপক্ষ তাদের মজুরি প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ফেলেছে এবং তাদের প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি হবে ৩০ হাজার টাকার ওপরে। তবে মালিকপক্ষ গতকাল পর্যন্ত তাদের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে পারেনি। এখনও তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় আছে। মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি এবং শিল্প মালিকদের সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে প্রথম বৈঠকের পর শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার ৬০টি নিবন্ধিত শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা, বিলস নেতা ও বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের মতামত নিয়েছেন। তার আলোকেই তিনি শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছেন।
এসব তথ্য জানিয়ে মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার সময়ের আলোকে বলেন, ‘গত তিন দিন আমি রাত-দিন ছুটে বেড়িয়েছি। শ্রমিক নেতাসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমি আমার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছি। কত চূড়ান্ত করেছি সেটি হুবহু এখন বলব না, সেটি মজুরি বোর্ডেই লিখিত আকারে জানাব। তবে এটা বলতে পারি, পোশাক শ্রমিকের জন্য আমার পক্ষ থেকে ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব থাকবে ৩০ হাজার টাকার ওপরে।’
এদিকে দেশে যতগুলো গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন আছে তারাও এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অতীতের মতো একেক সংগঠন একেক রকম মজুরি প্রস্তাব না দিয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তাব দেবে। এ লক্ষ্যে গত তিন দিনে ৫টি শ্রমিক জোটের নেতারা (৫০টি সংগঠন) দফায় দফায় বৈঠক করেন। গতকাল রোববারও এই জোটের নেতারা রাজধানীর পল্টনের বাসদ কার্যালয়ে বৈঠকে বসেছিলেন।
এ বৈঠকের বিষয়ে শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা ৫ শ্রমিক জোটের নেতারা বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি— একটি সমন্বিত মজুরি প্রস্তাব তৈরি করে আমরা মজুরি বোর্ডের যিনি শ্রমিক প্রতিনিধি আছেন তার কাছে সেটি দেব। এ জন্য ৫ জোটের ৫ নেতাকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আমরা সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মজুরি বোর্ডে আমাদের প্রস্তাব থাকবে ২৭ হাজার ৫০০ থেকে ৩৭ হাজার টাকা। তবে সোমবার (আজ) সকালে একেবারে সুনির্দিষ্ট করে একটি ফিগার উল্লেখ করে জমা দেব।’
এদিকে আজকের দ্বিতীয় বৈঠকে বোর্ডের স্বতন্ত্র সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রসাশন বিভাগের প্রফেসর ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সময়ের আলোকে জানান, তিনি এখনও কোনো মজুরি প্রস্তাব ঠিক করেননি। তবে মালিক এবং শ্রমিকপক্ষ কত মজুরি প্রস্তাব জমা দেয়, সেটি দেখে তিনি একটি প্রস্তাব ঠিক করবেন।
এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিনকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি কল ধরেননি। তবে বিজিএমইএর আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, ‘মালিকপক্ষ এখনও দ্বিধায় আছে, কত প্রস্তাব জমা দেবে সেটি আজ পর্যন্ত (গতকাল) ঠিক করা যায়নি। তবে সোমবার বৈঠকের আগ দিয়ে হয়তো একটি প্রস্তাব ঠিক করা হতে পারে অথবা মালিকপক্ষ সময়ও চাইতে পারে।’
অন্যদিকে এ বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, ‘মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে যাকে পাঠানো হয়েছে তিনি এখন পর্যন্ত আমার সঙ্গে বা বিকেএমইএর কোনো নেতার সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা করেননি। এ জন্য এই বিষয়ে আমার কাছে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই।’
মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠকেই যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে— ডিসেম্বর থেকেই মজুরি বাস্তবায়ন হবে, এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘প্রথম বৈঠকে কীভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিল আমি বুঝি না। আর ডিসেম্বর থেকেই কীভাবে নতুন মজুরি বাস্তবায়ন করা যাবে সেটিও আমি বুঝি না। কারণ অধিকাংশ কারখানা মালিক আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত অর্ডার নিয়ে বসে আছে। তা হলে ডিসেম্বরে যদি মজুরি বাস্তবায়ন করা হয় তা হলে নতুন মজুরি নিয়ে শিল্প মালিকরা কীভাবে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দেনদরবার করবেন। তাই মজুরির বিষয়ে আমি এখনও ধোঁয়াশার মধ্যে আছি।’
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা শেষে জানানো হয়, তৈরি পোশাক শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা। ডিসেম্বর মাসের বেতন জানুয়ারিতে পরিশোধের সময় নতুন মজুরি অনুযায়ী বাড়তি টাকা পাবেন শ্রমিকরা। সভায় বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্য ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
এখনও কাটেনি মালিকদের উদ্বেগ : এদিকে টানা কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের পর নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও কাটেনি উদ্বেগ। আন্দোলনের জেরে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বাতিল হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের কারখানা পরিদর্শন। এতে দেশের পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা।
অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ঘিরে অসন্তোষের নেপথ্যে উসকানির অভিযোগ তুলছে প্রশাসন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হলেও পোশাক শিল্পে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় টানা তিন দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের প্রভাব পোশাক শিল্পে পড়বে বলে মনে করছেন মালিকরা। আন্দোলনের কারণে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সফরও বাতিল হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প মালিকরা।
শিল্প মালিকদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খরচ এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। তবে আর কোনো শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি না হলে হয়তো পুষিয়ে নিতে পারবেন মালিকরা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়নি। তবে আন্দোলনের কারণে একেক কারখানাভেদে ক্ষতির পরিমাণ আলাদা আলাদা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সব কারখানার ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমার কারখানায় ইংল্যান্ডের একজন নতুন ক্রেতার আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি হোটেল থেকে কারখানায় আসেননি। পরদিন আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতার কারখানা পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রধান কার্যালয় থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা পাওয়ায় তারাও আসেননি। কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানার নয়, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি এমন পরিস্থিতি দেখলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে। আমাদের দেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করবেন। কোনো দেশের ঝুঁকির মাত্রা যতবেশি হয়, সেই দেশে পণ্যের দাম তত কম দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে