চীনের বাজারে বড় হিস্যার প্রত্যাশা

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

বাংলাদেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগের অন্যতম বৃহত্তম সঙ্গী চীন। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যেমন অনেক সমৃদ্ধ, তেমনি দেশের অবকাঠামো, পোশাক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তিসহ

2026-06-22T00:27:17+00:00
2026-06-22T08:25:06+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
অর্থনীতি
চীনের বাজারে বড় হিস্যার প্রত্যাশা
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ১২:২৭ এএম  আপডেট: ২২.০৬.২০২৬ ৮:২৫ এএম
বাংলাদেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগের অন্যতম বৃহত্তম সঙ্গী চীন। প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগের অন্যতম বৃহত্তম সঙ্গী চীন। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যেমন অনেক সমৃদ্ধ, তেমনি দেশের অবকাঠামো, পোশাক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তিসহ আরও অনেক খাতে প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে চীনের। তবে চীনা বিনিয়োগ বাড়লেও দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। এখানে চীনের একচেটিয়া প্রভাব।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে যাচ্ছেন। তার এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের হিস্যা কতটা বাড়বে তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। 

অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য হিস্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘চীন বাংলাদেশের সঙ্গে অনেকটা একপেশে বাণিজ্য করে আসছে। চীন বছরে ২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশে। বিপরীতে বাংলাদেশ চীনে পণ্য রফতানি কমে ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। 

এ তথ্যেই বোঝা যাচ্ছে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আকাশ-পাতাল তফাত। এই বিশাল ঘাটতি হুট করেই কমিয়ে আনা যাবে না কোনোভাবেই। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমার পথরেখা তৈরি হতে পারে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্যে চীনের সঙ্গে অনেক চুক্তি স্বাক্ষর হবে। যার মধ্যে বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তি আছে বেশ কয়েকটি। 

এসব চুক্তি হলে এবং সে অনুযায়ী পরে পথরেখা তৈরি করলে বাণিজ্য ঘাটতি কমতে পারে। এ ছাড়া চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাংলাদেশি পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফর ও চুক্তি পরবর্তী পদক্ষেপগুলো যেন ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হয়। কেননা অতীতেও আমরা দেখেছি, চীনের সঙ্গে অনেক চুক্তি হয়েছে কিন্তু পরের ধাপগুলো আর ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ জন্য চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রফতানিও বাড়ানো সম্ভব হয়নি।’

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যচিত্র : 

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য এখন সবচেয়ে বড়, কিন্তু একপক্ষীয়। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি। রফতানি প্রায় ৮৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। 

আবার ২০২২-২৩ অর্থবছর আমদানি হয়েছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশ। আর দেশটিতে রফতানি হয় ৭১৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির মাত্র ১.৬১ শতাংশ।

এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) চীনে প্রায় পৌনে ১ বিলিয়ন (৭৪ কোটি ২৫ লাখ) ডলারের পণ্য রফতানি করেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের রফতানিকারকরা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি। 

এর আগে কোনো আর্থিক বছরের পুরো সময়েও চীনে পণ্য রফতানি থেকে এই পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আসেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে রফতানির অঙ্ক ছিল ৬৪ কোটি ১৪ লাখ ডলার; আর পুরো সময়ে (জুলাই-জুন) আয় হয়েছিল ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। চীনের বাজারে পণ্য রফতানি থেকে এর আগে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে, ৯৪ কোটি ৯৪ লাখ ডলার।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান দ্বিতীয় বিদেশ সফর হিসেবে পূর্ব এশিয়ার দেশটিকে বেছে নিয়েছেন। এর আগে ২১-২২ জুন তিনি মালয়েশিয়া সফর করবেন।


প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারে নিয়ে যাওয়ার আশা করছেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম। 

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর চীনের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এমনিতেই শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার পর চীনে আমাদের রফতানি বাড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রফতানি হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর দুই বছরের মধ্যে এটি ৩ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে বলে আশা করছি। 

তবে এ জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু কাজ করতে হবে। রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। চীনের বাজার বিবেচনায় আমাদের উৎপাদন কৌশল ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য সহায়ক নীতিমালা এবং লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে চীনের বাজারে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে।’

চীন থেকে কোন ধরনের পণ্য বেশি আনে বাংলাদেশ : 

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা পণ্যের ৫৪ শতাংশ রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। এর মধ্যে পোশাক শিল্পের কাঁচামালই ৮০ শতাংশের মতো।

কাঁচামাল বেশি আনা হয়-সুতা, ফেব্রিক, বোতাম, জিপার। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের প্রায় ৯০ শতাংশই আনা হয় চীন থেকে। নির্মাণ খাতের সিমেন্ট ও রডের কাঁচামাল আনা হয় প্রচুর। চিকিৎসা খাতের ওষুধের কাঁচামাল, হাসপাতালের যন্ত্রপাতিও আসে অনেক। শিক্ষা খাতের কাগজের কাঁচামাল, ছাপার কালিও আমদানি করা হয় চীন থেকে। এ ছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি আগে জার্মানি বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি আসত, এখন সেটি চীনের দখলে চলে গেছে।

বাংলাদেশ কোন ধরনের পণ্য রফতানি করে : 

চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির তালিকাটা বেশ ছোট। বাংলাদেশ থেকে চীনে মূলত সামুদ্রিক খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট, ফার্মাসিউটিক্যালস বেশি রফতানি হয়। ২০২০ সালে চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও রফতানি তেমন একটা বাড়েনি। সুতরাং চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- পণ্য, কাঁচামাল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প এখন বাংলাদেশের হাতে নেই। এটি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী। তাই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে বাংলাদেশের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং চীনের বাজারে তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য রফতানি বাড়াতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাণিজ্যিকভাবে কতটা লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ : 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর শেষে আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করবেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তার এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে লাভবান হতে পারে। তবে সুবিধাগুলো নির্ভর করবে চুক্তিগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয় তার ওপর। সফরের মূল বাণিজ্যিক দিকগুলোর মধ্যে আছে- এই সফরে চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। 

এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, ২টি চুক্তি, ১টি অ্যাকশন প্ল্যান, ১টি প্রটোকল চুক্তি। চুক্তিগুলো হবে মূলত অবকাঠামো, প্রযুক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জ্বালানি বিষয়ে। এ ছাড়া তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে চীনা অর্থায়নে বড় প্রকল্প এলে নির্মাণ ও কর্মসংস্থান বাড়বে দেশে। প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, ডিজিটাল অবকাঠামোতে সহযোগিতা বাড়তে পারে। 

প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দেশটিতে রফতানি বৃদ্ধি পাবে। ২০২০ সাল থেকে চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। নতুন চুক্তিতে তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। আমদানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। চীন থেকে ৫৪ শতংশ আমদানি হয় রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। সরাসরি চুক্তি হলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। 

এ ছাড়া এই সফরের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন চীনের সঙ্গে ঘাটতি ২১ বিলিয়ন ডলার। রফতানি বাড়লে ঘাটতি কমবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে। চীনা বিনিয়োগ এলে উৎপাদন বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে। তিস্তা প্রকল্পে চীনা সহায়তা পেলে উত্তরবঙ্গের কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সফর সফল হলে স্বল্পমেয়াদে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ আসবে। দীর্ঘমেয়াদে লাভ হবে যদি রফতানি বাড়ে আর প্রযুক্তি হস্তান্তর হয়। কিন্তু শুধু চুক্তি স্বাক্ষর মানেই লাভ নয়, বাস্তবায়ন আর শর্তই আসল।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   চীন  বাজার  হিস্যা  প্রত্যাশা 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: