পুঁজিবাজারে জ্বালানি মূল্য ও সুদহারের প্রভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

জ্বালানির দাম বাড়ার পর বাড়তি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের আশঙ্কা আর উচ্চ সুদহার কমার প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া— দ্বিমুখী চাপে

2026-09-26T23:25:34+00:00
2026-09-26T23:25:34+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণ
পুঁজিবাজারে জ্বালানি মূল্য ও সুদহারের প্রভাব
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৫ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
জ্বালানির দাম বাড়ার পর বাড়তি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের আশঙ্কা আর উচ্চ সুদহার কমার প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া— দ্বিমুখী চাপে কেটেছে দেশের পুঁজিবাজারের গত সপ্তাহ। ২০ সেপ্টেম্বর বড় উত্থান দিয়ে সপ্তাহ শুরু হলেও পর দিন জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঘোষণা বাজারের সেই গতি থামিয়ে দেয়। অবশ্য এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও শেষ কার্যদিবসে আবার সূচকের পতন হয়েছে। ফলে সপ্তাহজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একদিকে কম দামে শেয়ার কেনার আগ্রহ দেখা গেছে, অন্যদিকে অর্থনীতির ব্যয় ও সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের সতর্কতায় সার্বিক বাজারে পতনের ধারায় শেষ হয়েছে সপ্তাহ।

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। যা আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ১ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৯২ পয়েন্টে ওঠে। এদিন ৩৮৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮৭টির শেয়ারদর বেড়েছিল। লেনদেনও বেড়ে ৭৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আগের চার কার্যদিবসের টানা উত্থানের ধারাবাহিকতায় এদিন বাজারে ব্যাপকভিত্তিক কেনাকাটা দেখা যায়।

কিন্তু সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেই বাজারের চিত্র পাল্টে যায়। সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে করপোরেট মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ২১ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স ৪১ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৫০ পয়েন্টে নেমে যায়। দর কমে ২৫৪টি প্রতিষ্ঠানের, বিপরীতে বাড়ে ১০০টির। তবে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অবস্থান বদলের কারণে লেনদেন বেড়ে ৭৮৮ কোটি টাকা হয়।


জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও লজিস্টিকস ব্যয় বাড়লে শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে একই বিক্রয়মূল্যে কোম্পানির মুনাফার মার্জিন কমতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও পরিবহননির্ভর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের হিসাব-নিকাশে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্যও ছিল, জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।

এর মধ্যেই ২২ সেপ্টেম্বর বাজারে সতর্কতা আরও স্পষ্ট হয়। ডিএসইএক্স ওই দিন আরও ১০ দশমিক ১৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৪০ পয়েন্টে নেমে আসে। দর কমে ২২৭টি প্রতিষ্ঠানের, আর বাড়ে ১০৩টির। তবে লেনদেন সামান্য বেড়ে ৭৯১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হয়। অর্থাৎ সূচকের চাপ থাকলেও বাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের সম্পূর্ণভাবে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি।

পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। কম দামে নেমে আসা শেয়ারে দরকষাকষির সুযোগ দেখে বিনিয়োগকারীরা আবার কেনাকাটায় ফেরেন। ওই দিন ডিএসইএক্স ৫৫ পয়েন্ট বা ১ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৫৯৬ পয়েন্টে ওঠে। ২৪৬টি প্রতিষ্ঠানের দর বাড়ে এবং লেনদেনও ৭ শতাংশ বেড়ে ৮৪৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। বাজার মূলধন এক দিনেই প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বাড়ে।

তবে এই উত্থানও স্থায়ী হয়নি। কারণ, ২৩ সেপ্টেম্বরই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি নীতিসুদ ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে জুলাইয়ে নীতিসুদ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। 

বাজারে প্রত্যাশা ছিল, মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে আরও কিছুটা নীতি-শিথিলতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় ২৪ সেপ্টেম্বরের লেনদেনে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইএক্স ১৭ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে নেমে আসে। ডিএসই-৩০ কমে ১০ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট এবং শরিয়াহ সূচক কমে ৩ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট। এদিন ১৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমলেও বাড়ে ১৪১টির। লেনদেন আগের দিনের ৮৪৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা থেকে কমে ৭৫৬ কোটি ৩১ লাখ টাকায় নেমে আসে।

অর্থাৎ সপ্তাহের বাজারচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির খবর বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও পরদিনই কিছু বিনিয়োগকারী কম দামের শেয়ারে ফিরেছেন। কিন্তু সুদহার অপরিবর্তিত থাকার খবর সেই পুনরুদ্ধারের ধারাকে শেষ কার্যদিবসে আবার থামিয়ে দিয়েছে। বাজারের দৈনিক ওঠানামায় তাই শুধু কোম্পানির নিজস্ব আর্থিক ফল নয়, এখন সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যয় ও অর্থের দামও বড় ভূমিকা রাখছে।

উচ্চ সুদহার পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি চাপ। ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদ তুলনামূলক বেশি থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে শেয়ারে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমতে পারে। একই সঙ্গে ঋণনির্ভর কোম্পানির অর্থায়ন ব্যয় বাড়লে মুনাফায় চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। 

বিপরীতে সুদহার কমলে কোম্পানির অর্থায়ন ব্যয় কমার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ারবাজারে বেশি সক্রিয় হতে পারে। এ কারণেই বাজারের একটি অংশ নীতিসুদ কমার প্রত্যাশা করছিল। ২৪ সেপ্টেম্বরের দরপতনে বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও সুদহারের প্রভাব সব খাতে একই রকম নয়। ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদহার আমানত ও ঋণের আয়-ব্যয়ের কাঠামোয় এক ধরনের প্রভাব ফেললেও উৎপাদনমুখী শিল্পে ঋণের খরচের পাশাপাশি জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। 

আবার যেসব কোম্পানি তুলনামূলক কম ঋণনির্ভর, তাদের ওপর সুদহারের সরাসরি চাপ অপেক্ষাকৃত কম হতে পারে। ফলে সামগ্রিক সূচকের ওঠানামার পাশাপাশি খাতভেদে কোম্পানির মৌলভিত্তিও বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সপ্তাহজুড়ে লেনদেনের দিক থেকেও ব্যাংক, ওষুধ, বস্ত্র ও অন্যান্য নির্বাচিত শেয়ারে আগ্রহ দেখা গেছে। ২০ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন ব্যাংক এককভাবে ৩৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে শীর্ষে ছিল। ব্যাংকটির প্রথমার্ধের মুনাফাও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির মতে, উচ্চ ট্রেজারি ইল্ড থেকে সরকারি সিকিউরিটিজে বেশি আয়, নন-ফান্ডেড আয় এবং পরিচালন দক্ষতা মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের বাজার বলছে, পুঁজিবাজার এখন শুধু সূচক ও লেনদেনের নিজস্ব গতিতে চলছে না; জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে দ্রুত প্রভাবিত করছে। 

সপ্তাহের শুরুতে ৬০ পয়েন্টের উত্থান, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর ৪১ পয়েন্টের পতন, পরদিন আরও ১০ পয়েন্ট কমা, ২৩ সেপ্টেম্বর ৫৫ পয়েন্টের পুনরুদ্ধার এবং শেষে ১৭ দশমিক ৮৯ পয়েন্টের পতন— এই ওঠানামাই বাজারের বর্তমান অনিশ্চয়তার চিত্র তুলে ধরে।

সময়ের আলো/কেএইচও
  বিষয়:   পুঁজিবাজার  জ্বালানি মূল্য  সুদহার  সাপ্তাহিক বাজার  বিশ্লেষণ 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: