রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ভূমিকম্পে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। মাঝারি ও ছোট মাত্রার ভূমিকম্প ঘন ঘন হওয়ায় এটি স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ নাকি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস, এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
সর্বশেষ গত ২২ জুন রাত ৯টা ২৯ মিনিটে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে সারা দেশ কেঁপে ওঠে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও রাজধানীবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩.২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকার প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে। গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। এতে ১০ জন নিহত হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। ওই ভূমিকম্পের পর নরসিংদী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক আফটারশকও রেকর্ড করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি বড় টেকটোনিক প্লেট, ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলে ভূমিকম্প একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, এসব ভূমিকম্প কখনো পুরোনো ফল্ট সক্রিয় হওয়ার কারণে আবার কখনো নতুন ফল্ট তৈরির ফলেও ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, ছোট ছোট ভূমিকম্প সবসময় বড় ভূমিকম্পের সরাসরি পূর্বাভাস নয়। তবে এগুলো ভূ-অভ্যন্তরের চাপ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে গবেষকদের একাংশ মনে করেন, শ্রীমঙ্গল, ডাউকি ও মধুপুর ফল্ট অঞ্চলে অতীতে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের ইতিহাস থাকায় এসব এলাকা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা ভূ-পৃষ্ঠে দৃশ্যমান নয় এমন ফল্টগুলো ঢাকার জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এগুলো শনাক্ত করা কঠিন।
ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুযায়ী ঢাকার কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে শক্ত মাটির ওপর অবস্থিত বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—রমনা, মগবাজার, নিউ মার্কেট, লালমাটিয়া, মিরপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, মতিঝিলসহ আশপাশের কিছু এলাকা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মাটির গঠন নয়, ভবনের মান ও নির্মাণবিধি অনুসরণ করাই প্রকৃত নিরাপত্তা নির্ধারণ করে।
হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) এক গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার ৫৬.২৬ শতাংশ ভবন ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে এবং আরও ৩৬.৮৭ শতাংশ মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ৬ লাখের বেশি ছয়তলার ওপরে, যেগুলো বড় ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৩২১টি অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের হালনাগাদ তালিকা নেই।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৭ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকার এক তৃতীয়াংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ১ লাখ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরি, ৪৫০টি অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট নির্ধারণ, উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় বৃদ্ধি, ভারী উদ্ধার সরঞ্জামের তালিকা প্রস্তুত এবং হাসপাতাল ও হেলিকপ্টার সক্ষমতা যাচাই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
সময়ের আলো/এসএকে