ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেই মাঠে নামেন সীমান্তের কৃষকরা। কিন্তু তাদের প্রতিটি দিন শুরু হয় এক অদৃশ্য শঙ্কা নিয়ে, আজ কি নিরাপদে বাড়ি ফেরা হবে, নাকি এ যাত্রাই হবে শেষ। ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের জনপদে জীবিকা আর মৃত্যুভয় যেন পাশাপাশি হাঁটে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ কৃষিকাজ করে আসছেন। তাদের অনেকের চাষের জমি কাঁটাতারের বেড়া কিংবা নো-ম্যানস ল্যান্ডের একেবারে কাছাকাছি। প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে সেই জমিতেই যেতে হয় তাদের।
সীমান্তে বসবাসকারী আব্দুল লতিফের ভাষ্য, এখানে শুধু কাঁটাতারের বেড়াই নয়, রয়েছে অদৃশ্য এক মানসিক চাপ। কখন, কোথায় কী ঘটবে? কেউ জানেন না। সীমারেখার খুব কাছে চলে যাওয়া কিংবা ভুলবশত নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের আশঙ্কা সবসময়ই তাড়া করে বেড়ায় তাদের।
শফিকুল আলম নামের আরেক বাসিন্দার অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কঠোর অবস্থানের কারণে আমরা সাধারণ কৃষকরা আতঙ্কের মধ্যে থাকি। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে মাঠে যাওয়াও আমাদের কাছে বড় ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে সীমান্ত এলাকাকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন অপরাধচক্র। গরু পাচার, মাদক, অবৈধ পণ্য ও মোবাইল ফোন চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়লেও দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ এসব ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না হলে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অপরাধচক্রের প্রলোভন থেকে মানুষকে দূরে রাখা কঠিন হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের নিরাপদ জীবনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমান্ত রক্ষায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সীমান্তবাসীরাও প্রতিদিন তাদের শ্রম, সাহস ও ত্যাগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
তবে, সীমান্তবাসীর প্রত্যাশা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে সীমান্তে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে অপরাধপ্রবণতাও অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/আআ