বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

সংসদ প্রতিবেদক

জাতীয়

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ‘বিতর্কিত’ ১৮(ক) ধারা বাতিল করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অংশীজনদের মতামতের

2026-06-30T02:38:20+00:00
2026-06-30T02:38:20+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
জাতীয়
বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
সংসদ প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ২:৩৮ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ‘বিতর্কিত’ ১৮(ক) ধারা বাতিল করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের বার্তা স্পষ্ট, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। 

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে নিজের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। অর্থের সংস্থান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজেটের সফলতা ঘোষণায় নয়, কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত। তাই বাজেটে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও লুণ্ঠিত আর্থিক খাত সংস্কার করে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করেছে। 

তিনি বলেন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম ও পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কিছু মন্তব্য এসেছে। আমি আজ দেশবাসীকে এ সংক্রান্ত দুটি বিষয়ে আশ্বস্ত করতে চাই। প্রথমত চুরি করা সম্পদ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আমাদের অবস্থান হলো জনগণের টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে বা পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আমি আমানতকারীদের আশ্বস্ত করতে চাই সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তোলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে।

বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করে। আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা এর শেয়ার ধারক ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এ সুযোগ দিতে পারবে। 


ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে নতুন ধারাটি যুক্ত করার পর বিতর্ক তৈরি হয়। সংসদে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এই বাজেট কেবল সরকারের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়; এটি জনজীবনে স্বস্তি আনা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপরেখা। 

উত্তরাধিকার হিসেবে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেলেও বর্তমান সরকারের থ্রি আর (রিকভারি, রেস্টোরেশন, রিকন্সট্রাকশন) কৌশলের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। 

প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনেকের সংশয়ের জবাব দেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করার মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।

প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি আস্থার প্রতিফলন। আইসিটি, কৃষি ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে অর্থনীতির মূলধারায় এনে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। আমরা করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করের ভিত্তি বাড়িয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই। প্রথমবারের মতো এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে আমরা ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের সুযোগ দিচ্ছি, তবে কাঁচাবাজার ও মুদি দোকান এর আওতার বাইরে থাকবে।

তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২৭.২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার অপ্রয়োজনে ঋণ নিয়ে দেশের ঋণধারণ সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমানে মোট ঋণের পরিমাণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা জিডিপির ৩৮.৬১ শতাংশ। এ ঋণের সুদ আমাদের সময়মতো পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এ সংকট কাটাতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছি। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে অর্থমন্ত্রী অর্থ বিলে বড় ধরনের কর ছাড়ের প্রস্তাব আনেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত রাখা, শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হলেই ২.৫ শতাংশ কর হ্রাস, আইপিও বা আরপিওর মাধ্যমে ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করলে আরও ২.৫ শতাংশ কর ছাড়, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনকারী তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিশেষ কর সুবিধা, ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর কর কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ৫ লাখ টাকার সীমা প্রত্যাহার।

আইএমএফ থেকে ‘শূন্য হাতে’ ফেরার সমালোচনা নাকচ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা শূন্য হাতে ফিরিনি। আগের সরকারের সময় নেওয়া কিছু শর্ত দেশ ও জনগণের পরিপন্থী হওয়ায় আমরা সেই প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন নতুন করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আইএমএফের সঙ্গে প্রোগ্রাম নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফর দেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বড় অবদান রাখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জ্বালানি খাতের চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এলএনজি টার্মিনাল বৃদ্ধি, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। এতে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

তিনি জানান, যেকোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হবে ১. ভ্যালু ফর মানি, ২. রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, ৩. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ৪. পরিবেশগত সুরক্ষা।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে অর্থমন্ত্রী ‘বি-নিয়ন্ত্রণকরণ’ নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যেন বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক না হয়ে সহায়ক হয়, সে জন্য অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা হবে। প্রতিটি সেবা প্রদানের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজেটের সাফল্য ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটাতে আমরা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করেছি। সঠিক নেতৃত্ব ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমানো, ব্যবসা সহজ করতে ডিরেগুলেশন, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তার ভাষায়, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে সরকার শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করছে।

বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি বাজেটের সাফল্য তার ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তবায়নে নিহিত। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি ও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ানোর ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   অর্থমন্ত্রী  আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: