সিরাজগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে আছে জাতীয় জুট মিল। একসময় যেখানে ছিল হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্য, মিলের সেই ভবনগুলো তালাবদ্ধ হয়ে নীরবভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বিরাজ করছে নীরবতা, ধুলা আর অবহেলার চিহ্ন। ভবনের ভেতরে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার মেশিন। বিশাল এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি এখন যেন এক নীরব সাক্ষী। সরকারের কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে থমকে গেছে এই মিলের ওপর নির্ভরশীল হাজারো শ্রমিকের জীবন। সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত মিলটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন মিলের শ্রমিক ও স্থানীয়রা।
এদিকে বর্তমানে বন্ধ থাকা মিলটির মরিচা ধরা মেশিন ও কোটি টাকার যন্ত্রাংশ দেখভাল করার জন্য ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। তাদের নিয়মিত বেতন বিদুৎ বিলসহ নানান খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে সরকারকে।
জানা যায়, সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় ১৯৬০ সালে ৭৫ একর জায়গার উপর নির্মাণ করা হয় জুট মিলটি। পরবর্তীতে জাতীয়করণ হয়ে ‘জাতীয় জুট মিল’ নামে পরিচিতি পায়। দীর্ঘদিন লাভজনক থাকলেও দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসানে পড়ে ২০০৭ সালে উৎপাদনসহ বন্ধ হয়ে যায় মিলটি। পরে শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে পুনরায় চালু হলেও ২০২০ সালের ১ জুন আবারও বন্ধ হয়ে পড়ে জাতীয় এই জুট মিলটি। ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ মিলটি ভাড়া নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০২৪ সালে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই পুনরায় বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই চরম সংকটে পড়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা।
জুল মিলটি বন্ধ হওয়ার পর বহু শ্রমিক পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। কথা হয় মিলের সাবেক শ্রমিক রতন আলী বলেন, মিল যখন চালু ছিল তখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতাম। কখনো বেশিও হতো। সংসার ভালো চলত। মিলটি বন্ধ হওয়ার পর সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে ঘটকালি করছি। এখানেও তেমন ইনকাম না থাকায় পাশাপাশি সামান্য জমিতে কৃষি কাজ করে খুব কষ্টে সংসার চালাচ্ছি।
শ্রমিক বেলাল হোসেন বলেন, এই জুট মিলই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। মিলটি বন্ধ হওয়ার পর বিভিন্ন কাজ করে বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনপাড় করছি। মিলটি চালু হলে আমরা যারা পুরাতন শ্রমিক আছি তাদেরকেই যেন কাজে নেওয়া হয় সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি।
জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) থেকে সিরাজগঞ্জের জাতীয় এই জুল মিলটি পরিচালনা হয়ে থাকে। বন্ধ থাকা মিলটি চালু করতে বিজেএমসি থেকে লিজের জন্য চেষ্টা চলছে। কেউ লিজ নিলেই আবার মিলটি চালু হবে। তিনি বলেন, বন্ধ থাকা মিলটি দেখভালের জন্য প্রায় ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। নিয়মিত সবার বেতনও পরিশোধ করা হচ্ছে। সবার বেতন বিদুৎ বিলসহ প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে আমরা আশা করছি খুব দ্রুত লিজের মাধ্যমে মিলটি চালু করতে পারবো।
স্থানীয়দের দাবি, দলীয়করণ ও লুটপাটের কারণেই বারবার মিলটি বন্ধ হয়েছে, ফলে হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। জরাজীর্ণ ভবন আর মরিচা ধরা যন্ত্রপাতির পরিবর্তে আবারও দ্রুত মিলটি চালুর মাধ্যমে প্রাণ ফিরে পেয়ে নতুন করে বাঁচুক হাজারো শ্রমিকের স্বপ্ন, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
সময়ের আলো/জোই