গুলশানে হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর, জঙ্গিবাদের ‘অস্তিত্ব’ নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের

2026-07-01T10:23:26+00:00
2026-07-01T10:40:55+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
গুলশানে হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর, জঙ্গিবাদের ‘অস্তিত্ব’ নিয়ে বিতর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৩ এএম  আপডেট: ০১.০৭.২০২৬ ১০:৪০ এএম
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতের সেই অভিশপ্ত হত্যাযজ্ঞে ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এই ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্তভাবে শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতের রায়ের পর মামলাটি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই হামলার প্রেক্ষাপট এবং দেশে ‘জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব’ নিয়ে খোদ সরকারের দায়িত্বশীল মহলে ও প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের বিপরীতমুখী বক্তব্য তৈরি হয়েছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হামলার পর ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ‘নব্য জেএমবি’র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট আইনি ধারার জটিলতার কারণে নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে সাত আসামির ফাঁসির সাজা কমিয়ে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ ও অর্থদণ্ডের আদেশ দেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ জুন হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

আইনজীবীরা জানান, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির মধ্যে ৬ জন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করেছেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ গত বছরের ৬ জুন কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হওয়ায় বর্তমানে ৬ আসামির আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এই মামলাটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বড় গুরুত্ব জড়িত রয়েছে। আপিল বিভাগে বিচারক স্বল্পতা সত্ত্বেও জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে রাষ্ট্রপক্ষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই মামলার শুনানির উদ্যোগ নেবে।

বিগত বছরগুলোতে ১ জুলাই এলে গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় নিহতদের স্মরণে পুলিশ ও বিদেশি দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে নানা আনুষ্ঠানিকতা দেখা যেত। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এবার দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন।

হামলা ঠেকাতে গিয়ে নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ভাস্কর্য ‘দীপ্ত শপথ’ ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা এখনো পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি এবার পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো বিশেষ কর্মসূচিও রাখা হয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার এম তানভীর আহমেদ বলেন, এবার আর ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো কর্মসূচি নেই। তবে সব দূতাবাস সমন্বয় করে ঢাকাস্থ ইতালি দূতাবাসে একটি ঘরোয়া স্মরণসভার আয়োজন করেছে।

হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর পূর্তিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের মন্তব্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেখানে ‘জঙ্গিবাদের বীজ’ এখনো রয়ে গেছে বলে সতর্ক করা হতো, সেখানে বর্তমান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা একে ভিন্ন চোখে দেখছেন।

এই প্রসঙ্গে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, দেশে কোনো জঙ্গি নাই, এখন ঠেকাতে হবে ছিনতাই। জঙ্গি থাকলে না জঙ্গি নিয়ে ভাবব। আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে, কীসের জঙ্গি? পেটের দায়ে লোকে ছিনতাই করে।

অনুরূপ সুর শোনা গেছে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের কণ্ঠেও। গত এপ্রিল মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি ‘জঙ্গি’ শব্দটিকে রিকগনাইজ (স্বীকার) করেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলের সময়; তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর এক্সিস্টেন্স (অস্তিত্ব) নেই।

তবে প্রশাসনের এই ঢালাও দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে জঙ্গিবাদ ছিল এবং এখনো আছে। আমরা দেখেছি এই প্রবণতার মানুষদের সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসার প্রবণতা ইদানীং তৈরি হয়েছিল, যা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে। আমরা একে কমব্যাট (দমন) করতে চাই।

২০১৬ সালের ১ জুলাই শুক্রবার রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ধারালো অস্ত্র ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি— রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। রাতভর জিম্মি দশায় তারা ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয়, ১ জন বাংলাদেশি-আমেরিকান এবং ২ জন বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হামলাকারীদের গ্রেনেড ও গুলিতে নিহত হন পুলিশের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

পরদিন সকালে সেনাবাহিনী ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনা করে মাত্র ১২ মিনিটে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটায় এবং পাঁচ আত্মঘাতী জঙ্গিই অভিযানে নিহত হয়। দীর্ঘ এক দশক পর এসে এই ঘটনার বিচারিক সমাপ্তি যেমন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ওপর ঝুলে আছে।


সময়ের আলো/কহু


  বিষয়:   জঙ্গিবাদ  হলি আর্টিজান  হামলা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: