জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন, বিদেশি দখলদারিত্ব এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক বিদ্রোহ। যা বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। এটি একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং একটি পচে যাওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপামর জনতার কাঠামোগত বিপ্লব।
এর কেন্দ্রে ছিল বৈষম্যের অবসান, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি। আন্দোলনের দুই বছর পূর্তিতে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে, যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
আন্দোলনের সময় মানুষের প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেখানে নাগরিকের অধিকার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে না। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের কার্যকর সুরক্ষা। পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সমবণ্টনও ছিল জনগণের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা। এই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ঐক্যমতের ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি করে গণভোটে তা পাস হয়।
যারা জুলাই সনদের পক্ষে, তারা মনে করেন এই লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো সনদের বাস্তবায়ন। অন্যদিকে সমালোচকরা বলেন, সেই বাস্তবায়ন অবশ্যই সাংবিধানিক কাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই হতে হবে।
সমর্থকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ক্ষমতার ভারসাম্য, সুশাসন এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। তারা মনে করেন, আন্দোলনের সময় যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে ঘোষিত সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়াতেও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিষয়গুলোর সংস্কার অবশ্যই সংবিধানসম্মত পদ্ধতি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে আইনগত, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির সমন্বয় অপরিহার্য।
গত দুই বছরে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের মধ্যে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি এখন আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনও জবাবদিহির প্রশ্নে আগের তুলনায় বেশি সক্রিয়। আন্দোলনের শহিদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, আহতদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সেল গঠন এবং তাদের পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ বিপ্লবের নায়কদের প্রতি রাষ্ট্রের কৃতজ্ঞতার এক বড় প্রমাণ।
দেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো ভয়ের সংস্কৃতির অবসান। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকরা এখন সরকারের যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা অত্যন্ত স্বাধীনভাবে করতে পারছেন, যা দুই বছর আগেও ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। আন্দোলনের সময় যে দ্রুত ও মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই এখনও অপূর্ণ। রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধীরগতি, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা মানুষের প্রত্যাশা পূরণের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
আন্দোলনের অংশীজনরা মনে করেন, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন। নাগরিকরা এখন তাদের অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন। তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ করেছে যে, শান্তিপূর্ণ ও সংগঠিত জনমত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এই সচেতনতা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ।
অন্যদিকে আন্দোলনের চেতনাকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল আবেগ নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, স্বচ্ছ নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতিবিরোধী কার্যকরব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো আন্দোলনের সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে নয় বরং রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যেই তার প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত থাকে।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে বলা যায়, জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে, নাগরিকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামনে এনেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আন্দোলনের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে তার ঘোষিত আদর্শ বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছরের মূল্যায়নে তাই প্রাপ্তি যেমন রয়েছে, তেমনি অপূর্ণতাও রয়েছে। সামনে পথ আরও দীর্ঘ। সেই পথচলায় রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই নির্ধারণ করবে জুলাইয়ের স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নেবে। জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্রের কার্যক্রমের ব্যবধান যত কমবে, ততই জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগ ও চেতনা অর্থবহ হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির সময়ের আলোকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুথান পরবর্তী সময়ে আমাদের ৩টি বিষয়ে প্রত্যাশা ছিল, সেটা হচ্ছে গণহত্যার বিচার শেষ করা এবং বিচার কার্যকর করা। রাষ্ট্র সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচন। আমরা মনে করি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা সুষ্ঠু হয়নি। তারপরও আমরা জাতির ঐক্যের প্রশ্নে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে বা ঐকমত্য থেকে আমরা সংসদকে মেনে নিয়েছি। আমরা এখন সংসদে এবং রাজপথে সমানভাবে এসব সমাধানের চেষ্টা করছি।
কিন্তু গণহত্যার বিচার মানে যারা খুনের নির্দেশদাতা, যোগানদাতা, উৎসাহদাতা...তাদের কারোই এখনও সেভাবে বিচার এবং বিচার কার্যকর হয় নাই। অনেকের লঘু শাস্তি দেওয়া উচিত। এখন যেমন আজকে হাসান ইনুকে দেয়া হয়েছে। এটা বিচারের নামে প্রহসন। এ ছাড়া যারা বিভিন্ন প্রশাসনে, আমলাতন্ত্রে, পুলিশে যারা খুনি ছিল তাদের জন্য যদি একটি আলাদা ট্রাইব্যুনাল করলে বিচারটা কনফার্ম হতো। আমরা এখন পর্যন্ত বিচারের ব্যাপারে রাষ্ট্রের এবং আমাদের যে সরকার তাদেরও উদাসীনতা দেখতেছি।
সংস্কার প্রশ্নে তিনি বলেন, ঐক্যমত কমিশন থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী পুরো ১৮ মাস সময় নষ্ট করছে সংস্কার সংস্কার সংস্কার করে। এখন বিএনপি জুলাই সনদ বা সংস্কার কিছুই মানছে না। আর এর জন্য আমরা দায়ী করতেছি বিএনপি আর হচ্ছে এর পিছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। আমাদের প্রত্যাশার চাইতে প্রাপ্তি খুবই কম।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান তুহিন সময়ের আলোকে বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল জাতীয় সরকার গঠন করতে না পারা এবং ৭২-এর ফ্যাসিবাদী সংবিধান বাতিল করতে না পারার মাধ্যমে অর্ধেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
তারপরও জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয় এবং গণভোটে সেটা পাস হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই গণভোট অস্বীকার করছে এবং জুলাই সনদে যে তারা স্বাক্ষর করেছে সেটার সঙ্গেও তারা প্রতারণা করেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নসহ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি একমত না হওয়ায় সত্যিকার অর্থে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে