কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শেষ ষোলোর ম্যাচের কয়েকটি মুহূর্ত এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। লিওনেল মেসির দারুণ দৌড়, লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত পাস, এরপর মার্তিনেজের দুর্দান্ত গোল এবং অতিরিক্ত সময়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড থেকে আসা আত্মঘাতী গোল— সব মিলিয়ে নাটকীয় জয় তুলে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
মজার বিষয় হলো, দলের ত্রাতা হয়ে ওঠা মার্তিনেজ ও রোমেরো কেউই আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নন। দুজনই সেন্টারব্যাক, যাদের মূল দায়িত্ব নিজেদের রক্ষণভাগ সামলানো। তবে প্রয়োজনে তাঁরা আক্রমণেও সমান কার্যকর হয়ে ওঠেন।
১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া এই দুই ফুটবলারের বন্ধুত্বের শুরু বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে। সেই সময় থেকেই একদিন একসঙ্গে দেশের হয়ে বড় সাফল্য অর্জনের স্বপ্ন দেখতেন তাঁরা। যদিও জাতীয় দলে অভিষেক আগেই হয়েছিল, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আগে নিয়মিতভাবে একসঙ্গে খেলার সুযোগ খুব একটা হয়নি।
কাতার বিশ্বকাপ চলাকালীন আরেক সতীর্থ নাহুয়েল মলিনাকে নিয়ে রোমেরো ও মার্তিনেজ গড়ে তোলেন একটি ছোট্ট বন্ধুমহল, যার নাম দেন ‘দ্য পালো সান্তো গ্যাং’।
এই নামের পেছনেও রয়েছে একটি ভিন্ন গল্প। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের পর পুরো দল মানসিকভাবে চাপে পড়ে যায়। তখন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস অনুযায়ী ‘পালো সান্তো’ নামে পরিচিত সুগন্ধি কাঠ জ্বালানোর পরামর্শ দেন। অনেকের বিশ্বাস, এই কাঠের ধোঁয়া অশুভ শক্তি বা ‘নজর’ দূর করে এবং ইতিবাচক শক্তি নিয়ে আসে।
সেই থেকে আর্জেন্টিনা দলে এটি এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং চলতি বিশ্বকাপেও প্রতিটি জয়ের পর পালো সান্তো কাঠ জ্বালাতে দেখা গেছে ফুটবলারদের।
সম্প্রতি কানসাস থেকে মায়ামিতে যাওয়ার পথে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশিতেও এই রীতির কথা সামনে আসে। তল্লাশির সময় নিরাপত্তাকর্মীরা পালো সান্তো জ্বালানোর লাইটারটি নিয়ে নিলে পুরো ঘটনাটি নিয়ে হাস্যরসে মেতে ওঠেন লিওনেল মেসিসহ দলের খেলোয়াড়রা। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
পালো সান্তোতেই সীমাবদ্ধ নয় আর্জেন্টিনার আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। কেপ ভার্দের ম্যাচের পর ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ম্যাচ চলাকালেই এক সহকারী ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের হাতে পবিত্র জল তুলে দেন। এরপর দুজন একে অপরের হাতে সেই জল ছিটিয়ে দেন।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নানা রীতি অনুসরণ করা আর্জেন্টিনা দলের জন্য নতুন কিছু নয়। বড় প্রতিটি টুর্নামেন্টেই ড্রেসিংরুমে ধর্মীয় প্রতীক ও পবিত্র ছবি রাখা হয়। এমনকি ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর ট্রফিটিও উপাসনালয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া।
মাঠের মতো মাঠের বাইরেও রোমেরো ও মার্তিনেজের বন্ধুত্ব সমান দৃঢ়। তাদের দুজনের পায়েই রয়েছে একই ধরনের ট্যাটু। সেখানে বিশ্বকাপ ট্রফির নিচে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রোমেরো, মার্তিনেজ ও তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাহুয়েল মলিনা। ২০২২ সালের সেই বিশ্বজয়ের স্মৃতি ধরে রাখা এই ট্যাটুর মতোই আর্জেন্টিনার জার্সিতে সামনে আরও অনেক সাফল্যের গল্প লিখতে চান এই তিন সতীর্থ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ