পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ইরান। যুদ্ধ বা বৈরী পরিস্থিতিতে তেহরান এই জলপথটি বন্ধ করে দিলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি ও আমদানিব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এই ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবং ইরানকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করতে উপসাগরীয় মিত্ররা একজোট হয়ে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলার এক বিশাল মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলি নিয়ে দ্য নিউ আরব, মিডল ইস্ট আই, দ্য ন্যাশনাল, সৌদি গ্যাজেট, গালফ নিউজ ও আলজাজিরায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরাখবর বিশ্লেষণে এমন তথ্য সামনে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের ওপর নির্ভরতা কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত দুই স্তরের ‘বাইপাস’ বা বিকল্প পথ তৈরির কৌশল নিয়েছে। একদিকে জ্বালানি পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং অন্যদিকে সড়ক, রেল ও বন্দর উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে তারা।
সৌদি আরব তার পূর্ব উপকূলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো থেকে লোহিত সাগরের ‘ইয়ানবু’ বন্দর পর্যন্ত তাদের বিদ্যমান ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পেট্রোলাইন’ নামক পাইপলাইনটির সক্ষমতা বাড়াতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে তারা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘জেদ্দা-দাহাম রেলওয়ে’ নামের রেলপথসহ বিভিন্ন মহাসড়কও সম্প্রসারণ করছে। মূলত পারস্য উপসাগর ব্যবহার না করেই পশ্চিমে পণ্য পাঠানোর জন্য এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে রিয়াদ।
এদিকে আমিরাতের ফুজিরাহ ও খোরফাক্কান বন্দর দুটি হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরে অবস্থিত। তাই ২০২৭ সালের মধ্যে নিজেদের দ্বিতীয় ‘ওয়েস্ট-টু-ইস্ট পাইপলাইন’ চালু করার জন্য দ্রুত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে আমিরাত। এতে করে ফুজিরাহ বন্দর দিয়ে তাদের তেল রফতানি ক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়বে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির বাইরে সরাসরি আরব সাগরে প্রবেশাধিকার থাকায় ওমানের ‘সোহাল’, ‘দুকম’ ও ‘সালালাহ’ বন্দরগুলোকে বিকল্প বাণিজ্যিক রুট হিসেবে গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানকে কোণঠাসার পরিকল্পনা কাগজে-কলমে যতটা শক্তিশালী, উপসাগরীয় মিত্রদের ভেতরের রাজনৈতিক কোন্দল ও অবিশ্বাসের কারণে বাস্তবে তা ততটাই জটিল। সর্বপ্রথম জটিলতা হলো ঐক্যের অভাব। উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার বা জিসিসি আওতাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোনো একক মুদ্রা, একক প্রতিরক্ষা নীতি বা পুরোপুরি কার্যকর শুল্ক ইউনিয়নই নেই। আরেকটি বিষয় হলো কাতার ও কুয়েতের মতো তুলনামূলক ছোট দেশগুলো ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালির ভেতরে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ।
কাতার যদি সৌদি বা আমিরাতের ওপর দিয়ে বিকল্প পাইপলাইন বা রেল রুট করতে চায়, তবে ২০১৭-২০২১ সালের কাতারের ওপর ইরানের আরোপিত অবরোধের মতো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চাপের শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত যদি সৌদির ভূখণ্ড ব্যবহার করতে চায় তবে সেখানে রিয়াদের একক আধিপত্যবাদের শঙ্কা রয়েছে। এমনকি ইরাক রুটের নিরাপত্তা নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে।
এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সামগ্রিক জোটবদ্ধতার চেয়ে বর্তমানে প্রতিটি দেশ কেবল নিজের দেশের সীমানার ভেতরেই প্রকল্পগুলো সীমাবদ্ধ রাখছে। তবে হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি এড়াতে উপসাগরীয় মিত্ররা আরও কিছু বড় আন্তর্জাতিক মেগা প্রজেক্টের দিকেও নজর দিচ্ছে। যেমন ইরাক-তুরস্ক করিডোর। পারস্য উপসাগরকে ইরাক ও তুরস্কের মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য একটি রেল ও সড়ক করিডোর নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ইরাকের ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা এবং মিলিশিয়াদের প্রভাব এই পরিকল্পনা মন্থর করছে।
আরেক বিকল্প হলো আরব গ্যাস পাইপলাইন ও হিজাজ রেলওয়ে। জর্ডান এবং সিরিয়া হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত আরব গ্যাস পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং হিজাজ রেলওয়ের ট্র্যাকের কারিগরি বৈষম্যের কারণে এগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। অন্য একটি বিকল্প হিসেবে ভারত উপসাগরীয় পাইপলাইনের কথাও উঠছে। এর আওতায় ভারত, ওমান এবং আমিরাতের মধ্যে একটি সমুদ্রতলদেশীয় পাইপলাইন নির্মাণের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা থাকলেও এর বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
আবার শুধু বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করলেই যে ইরানকে পুরোপুরি বাগে আনা যাবে এমনটাও সম্ভব না। হরমুজের বাইরে কোনো করিডোর তৈরি করলেই তা নিরাপদ নয়। ইরান অতীতেও সৌদির মূল পাইপলাইন এবং ওমানের বন্দরে আঘাত হেনেছে। ফলে যেকোনো বিকল্প অবকাঠামোই যুদ্ধের সময় ইরানি মিসাইল বা ড্রোনের আওতার বাইরে থাকবে না। তা ছাড়া স্থলপথ, রেল বা পাইপলাইন কখনোই সমুদ্রপথে বিশাল জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের বিশাল পরিমাণের কাছাকাছিও যেতে পারে না।
উপসাগরীয় মিত্ররা একজোট হয়ে কিংবা আলাদাভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট সাজাচ্ছে মূলত বাধ্য হয়ে। হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ ‘বাইপাস’ বা বাদ দেওয়া যে সম্ভব নয়, সেটা তাদের অজানা নয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে যে, ইরানের সম্ভাব্য কোনো অবরোধের মুখে নিজেদের অর্থনীতি যেন সম্পূর্ণ ধসে না পড়ে এবং তারা যেন টিকে থাকতে পারে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ইরানকে সম্পূর্ণরূপে কোণঠাসা করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ হরমুজ প্রণালি বাইপাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ বিকল্প রুটটিও বাস্তবে দীর্ঘ এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও