টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত প্রধান চারটি নদ-নদীর পানি একসঙ্গে বাড়ছে। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তা- প্রতিটি নদীতেই গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য হারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবে বিপৎসীমা ও বর্তমান পানির উচ্চতার ব্যবধান যেভাবে কমে আসছে, তাতে স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর ১২টায় রেকর্ড করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জেলার সবচেয়ে বড় নদী যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের ফুলছড়ি পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৮৩ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ধরা হয় ১৯ দশমিক ৩৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার ১৫২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীটি। গত এক দিনেই এই পয়েন্টে পানি বেড়েছে ১৩ সেন্টিমিটার।
একই চিত্র দেখা গেছে জেলা শহর ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ঘাঘট নদীতেও। নিউ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপৎসীমার ১৫৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে। বর্তমান পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৭০ মিটার, বিপরীতে বিপৎসীমা ২১ দশমিক ২৫ মিটার। চার নদীর মধ্যে ঘাঘটের পানি বৃদ্ধি উদ্বেগজনক; ২০ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে গত ২৪ ঘণ্টায়।
জেলার করতোয়া নদীর চকরহিমাপুর পয়েন্টেও পানি বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট। এই পয়েন্টে বর্তমান পানির উচ্চতা ১৮ দশমিক ৭১ মিটার, যা বিপৎসীমা ১৯ দশমিক ৭০ মিটারের ৯৯ সেন্টিমিটার নিচে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই নদীতে পানি বেড়েছে ৩২ সেন্টিমিটার, যা চার নদীর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হার।
অন্যদিকে, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে। এই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ২৮ দশমিক ৯৩ মিটার এবং বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার। গত এক দিনে তিস্তায় পানি বেড়েছে ৮ সেন্টিমিটার, যা তুলনামূলক কম হলেও সামগ্রিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পানি বৃদ্ধির এই ধারার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতকে। রবিবার (১২ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল ৯টা- এই ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা জেলায় ৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা মৌসুমের হিসেবে যথেষ্ট উচ্চ মাত্রার।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ভারী এই বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি উজানের ঢলও নদীগুলোর পানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে হালকা ও ভারী বৃষ্টিতে জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। তবে পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর এই সময়ে নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করলে, চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাতে শুরু করেন।
বিশেষ করে তিস্তা, যমুনা-ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, পানি বাড়ার এই গতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও বর্তমানে কোনো নদীর পানিই বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, তবে চারটি নদীতেই একযোগে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা এবং তুলনামূলক ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজরদারি রাখছে বলে জানা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরবর্তী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে কি না।
কৃষি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে চরাঞ্চলের ফসল, বিশেষত মৌসুমি সবজি ও পাট খেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
সময়ের আলো/মহু