চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ভয়াবহ বন্যার ষষ্ঠ দিনে (১৩ জুলাই) পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও, উপজেলার নিম্নাঞ্চলে এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। পানিবন্দি থাকার পর বন্যাকবলিত মানুষ এখন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, কাদা ও আবর্জনায় ভরে যাওয়া ঘরবাড়ি পরিষ্কার, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারের মতো নতুন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।
উপজেলার কেঁওচিয়া, ঢেমশা, বাজালিয়া, সোনাকানিয়া ও কালিয়াইশ, নলুয়া, আমিলাইষ ইউনিয়নের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি পুরোপুরি নামেনি। অনেক পরিবার ঘরে ফিরলেও, কাদা ও দুর্গন্ধে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বাড়িঘর। বন্যায় ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, কাপড়চোপড় এবং মজুত রাখা চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক পরিবার এখন রান্না করার মতো পরিবেশও পাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার কৃষি খাত। বিস্তীর্ণ এলাকার আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক বছরের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পানি পুরোপুরি না নামলে, ফসলের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। একইসঙ্গে মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও, এখনও পানিতে ডুবে থাকা অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে, বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। নিরাপদ খাবার পানির সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। অনেকের মোবাইল ফোন দীর্ঘদিন চার্জ দিতে না পারায়, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগও ব্যাহত হয়েছে।
দীর্ঘ সময় পানিবন্দি থাকায় দুর্গত এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। এছাড়া, বন্যার পানিতে আশ্রয়স্থল হারিয়ে লোকালয়ে সাপের উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি ও বিশুদ্ধ পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
অন্যদিকে, উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে পানি ঢুকে দোকানপাটের মালামাল নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
দুর্গত এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে, দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক পরিবার এখনো শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে পানি কমতে শুরু করায় সাতকানিয়া–বাঁশখালী সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক থেকেও পানি নেমেছে। তবে, পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন ইউনিয়নের অনেক গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে এবং কোথাও কোথাও সড়কের বড় অংশ পানির তোড়ে বিলীন হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম–বান্দরবান মহাসড়কের সাতকানিয়ার সত্যপীরের দরগা এলাকায় পানি কিছুটা কমায়, সীমিত পরিসরে যান চলাচল শুরু হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, সরকারিভাবে ইতোমধ্যে ৫ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট, মিনারেল ওয়াটার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ১৭৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব ত্রাণসামগ্রী পর্যায়ক্রমে বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করছে।
সময়ের আলো/মহু