চলমান উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এইচএসসি) বিজ্ঞান বিভাগের একটি বিষয়ের প্রশ্নপত্রে একাধিক ভুল থাকাকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এইচএসসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নে ভুল রেখে কীভাবে সেটি ছাপানো হলো এবং তা পরীক্ষার কেন্দ্রেও চলে গেল সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে।
সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি নিয়ে বিক্ষোভ ও সমালোচনা শুরু হওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে যে, পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের সৃজনশীল অংশের দুটি প্রশ্নে ভুল ছিল।
এ ভোগান্তির জন্য দুঃখপ্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দাবি করেছেন, তারা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রশ্নগুলো তৈরি করা হয়েছিল। খবর বিবিসির বাংলার।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা দায়িত্ব পেয়েছি চার মাস। আগের কোয়েশ্চেন মডারেটর কোয়েশ্চেন করেছিল। আপনি জানেন, কোয়েশ্চেন মডারেট করতে হলে এ প্রক্রিয়াটি দুই বছর আগে থেকে শুরু করতে হয়। আমরা এসে কোনো কোয়েশ্চেন তৈরি করতে পারিনি। বিগত গভর্মেন্টের যে মডারেটর ছিল, তারাই কোয়েশ্চেন করেছে।
তবে যে প্রশ্নগুলোতে ভুল ধরা পড়েছে, খাতা মূল্যায়নের সময় সেগুলোর পূর্ণ নম্বর যোগ করে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এছাড়া যেসব শিক্ষকের ওপর প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করার দায়িত্ব ছিল, তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা ও খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া
বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ স্পর্শকাতর এবং সময়সাপেক্ষ। যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম হোসেন আলী বলেন, একটি প্রশ্নপত্রের খসড়া তৈরি করার পর সেটি চূড়ান্ত করে পরীক্ষার হল পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েকটি ধাপ পার করতে হয়। এক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে নির্বাচিত কিছু শিক্ষক ও কর্মকর্তা যুক্ত থাকেন এবং প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ঘোষণা করেছে, এখন থেকে দেশের সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে। সেই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুলাই থেকে বাংলাদেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের প্রতিটি বিষয়ে বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) এবং সৃজনশীল-এই দুই অংশের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, এখন যেসব প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, সেটি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত বছর। কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য প্রতিটি শিক্ষাবোর্ডেই আলাদা একটি করে তালিকা থাকে।
এস এম হোসেন আলী জানান, সাধারণত অভিজ্ঞ শিক্ষকরাই ওই তালিকায় স্থান পান এবং প্রশ্নপত্র তৈরির ওপর তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তালিকাভুক্ত ওই শিক্ষকদের মধ্য থেকে একেকটি বিষয়ে চারজন শিক্ষককে খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরি করতে বলা হয়। জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, সাধারণত পরীক্ষা শুরুর অন্তত এক বছর আগে প্রশ্নকর্তাদের খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরি করতে বলা হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যে যারা যে বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী, তারাই ওই বিষয়ে প্রশ্ন তৈরির দায়িত্ব পান।
খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য প্রশ্নকর্তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই সময়ের মধ্যে তারা সিলেবাস অনুযায়ী প্রশ্নের খসড়া তৈরি করেন। এক্ষেত্রে চারজন শিক্ষক আলাদাভাবে চারটি খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। কার প্রশ্নে কী আছে, কেউ জানতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ শিক্ষা বোর্ড কার্যালয়ের নির্দিষ্ট কক্ষে অবস্থান করে তারা প্রশ্নপত্রের খসড়া তৈরি করেন। ওই সময় অন্যদের কাছ থেকে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। মোবাইল ফোন, ক্যামেরা বা অন্য কোনো রেকর্ডার সেখানে নেওয়া নিষিদ্ধ থাকে। খসড়া প্রশ্নপত্র তৈরির পর একটি নির্দিষ্ট খামে সিলগালা করে সেগুলো বোর্ডে জমা দেন প্রশ্নকর্তা শিক্ষকরা।
সংশোধন, পরিমার্জন ও সেট চূড়ান্তকরণ
খসড়া তৈরির পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেগুলোর ভুল সংশোধন এবং পরিমার্জনের জন্য আরও চারজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা শিক্ষা বোর্ডের নির্দিষ্ট কক্ষে প্রশ্ন সংশোধন ও পরিমার্জনের কাজটি করে থাকেন। কেউ চাইলে আগের প্রশ্ন বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্রও যোগ করতে পারেন।
তবে প্রশ্নে যেন ভুল না থাকে বা প্রশ্নপত্র যেন ফাঁস না হয়, সেজন্য আগের প্রশ্নকর্তাদের মতোই তাদেরও কাজের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। এস এম হোসেন আলী বলেন, এমনকি খাবার-দাবারের জন্যও তারা বাইরে বের হতে পারেন না। কর্তব্যরত অবস্থায় তাদের খাবার-দাবার রুমেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কারণ প্রশ্ন চূড়ান্ত হওয়ার জন্য এই ধাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
একেকটি বিষয়ের প্রশ্ন সংশোধন-পরিমার্জনের জন্যও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়ে থাকে। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে আগের মতোই তারা একটি নির্দিষ্ট খামে যে যার মতো প্রশ্নপত্র সিলগালা করে স্ব স্ব শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন।
সংশোধন ও পরিমার্জনের পর প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড থেকে একেকটি বিষয়ের ওপর চার সেট করে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়। এরপর সিলগালা করে সেগুলো পাঠানো হয় ঢাকায় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির কার্যালয়ে। সাধারণত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এই কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তিনি সবগুরো বোর্ডের প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর সব বোর্ডের কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান। সেখানে সবার সামনে লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে চার সেট করে প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে দুই সেট সরাসরি বিজি প্রেসে ছাপার জন্য পাঠানো হয়। বাকি দুই সেট সংরক্ষণ করা হয়, যাতে প্রয়োজন হলে সেগুলো ব্যবহার করা যায়।
উল্লেখ্য, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড় ধসের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কিছু পরীক্ষা স্থগিত করে সেগুলো পরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে বিকল্প প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
যদিও এর আগে, প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে আলাদা আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হতো। তখন এক বোর্ডের চেয়ারম্যান আরেক বোর্ডের জন্য লটারি করে প্রশ্নপত্র নির্বাচন করতেন। কিন্তু এবছর সারা দেশে পরীক্ষা হচ্ছে একই প্রশ্নপত্রে। তারপরও অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নয়টি সাধারণ বোর্ড থেকে মোট ৩৬ সেট প্রশ্নপত্র আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির কাছে জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, লটারি হওয়ার পর কর্মকর্তাদের কেউ সেটি আর দেখতে পারেন না। সিলগালা অবস্থায় প্রতিটি বিষয়ের দুই সেট প্রশ্নপত্র ছাপানোর জন্য পাঠানো হয় বিজি প্রেসে।
ছাপাখানা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্র
লটারির মাধ্যমে সেট চূড়ান্ত করার পর ছাপানোর জন্য সেগুলো নেওয়া হয় সরকারি ছাপাখানায়। এরপর পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা অনুযায়ী, কোন বোর্ডে কী পরিমাণ প্রশ্নপত্র লাগবে, সেটার একটা হিসাব সেখানে পাঠানো হয়। জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, প্রেসে পাঠানোর পর সব বোর্ডের প্রশ্ন ছাপানো শেষ হতে কখনো কখনো দুই-আড়াই মাসও সময় লেগে যায়। সেজন্য পরীক্ষার অন্তত তিন থেকে চার মাস আগে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রগুলো ছাপাখানায় নেওয়া হয়। চাহিদাপত্র হাতে পাওয়ার পর সেখানকার কর্মকর্তারা সেটি অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ছাপান।
এস এম হোসেন আলী বলেন, এক্ষেত্রে যারা ছাপানোর কাজে যুক্ত রয়েছেন, তারাও যেন প্রশ্ন না দেখেন বা ফাঁস না করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা হয়। ছাপানো শেষ হলে প্রশ্নভর্তি প্যাকেট সিলগালা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর লোহার ট্রাংকে ভরে সেগুলো রাখা হয় জেলার ট্রেজারি কার্যালয়ে।
এরপর পরীক্ষার কয়েকদিন আগে সেগুলো উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। জেলা সদরে সাধারণ ট্রেজারিতে রাখা হলেও উপজেলা পর্যায়ে প্রশ্নপত্র রাখা হয় থানায় পুলিশ স্টেশনে। এস এম হোসেন আলী জানান, এরপর পরীক্ষার দিন সকালে পুলিশি পাহারায় সেগুলো পাঠানো হয় পরীক্ষা কেন্দ্রে। এক্ষেত্রে সব কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র ঠিকঠাক পৌঁছেছে কিনা, সেটি দেখভালের দায়িত্বে থাকেন স্ব স্ব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা।
কেন্দ্র প্রশ্নপত্রের প্যাকেজ পৌঁছালেও কেউ চাইলেই ইচ্ছামত সময়ে সেটির সিলগালা খুলতে পারেন না। জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, এক্ষেত্রে নিয়ম হলো পরীক্ষা শুরুর ৪০ থেকে ৫০ মিনিট আগে ঢাকায় আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছাপানো সেট দুটি থেকে লটারির মাধ্যমে এক সেট প্রশ্নপত্র নির্বাচন করবেন। এরপর তিনি সেটি অন্যান্য সব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসককে জানিয়ে দেবেন। জেলা প্রশাসক ও বোর্ড চেয়ারম্যানরা জানার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে সেটির তথ্য কেন্দ্রগুলোতে কর্তব্যরত শিক্ষকদের পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর কেবল প্রশ্নপত্রের ওই একটি সেট খুলে সেটিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়। আর প্রশ্নপত্রের দ্বিতীয় সেটটি অক্ষত অবস্থায় বোর্ড অফিসে ফেরত পাঠানো হয়।
তবুও ভুল কেন?
কর্মকর্তারা বলছেন, স্কুল-কলেজের পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় যে প্রক্রিয়ায় প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়, সেখানে ভুল থাকার সুযোগ সেভাবে থাকে না। তারপরও মাঝে মধ্যেই প্রশ্নপত্রে ভুল দেখা যায়।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম হোসেন আলী বলেন, এর মধ্যে কিছু কিছু ভুল হয় প্রিন্টিং মিসটেক বা ছাপানোর ত্রুটির কারণে। এক্ষেত্রে ছাপানোর পর থেকে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রশ্নপত্র দেখার সুযোগ না থাকার কারণে এ ধরনের ত্রুটির বিষয়ে জানা বা সংশোধন করার সুযোগ থাকে না বলে জানান কর্মকর্তারা।
কিন্তু সম্প্রতি উচ্চ মাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নে যে দুটি ভুল ধরা পড়েছে, সেটি কোনো ছাপানোজনিত ত্রুটি ছিল না। এস এম হোসেন আলী আরও বলেন, এক্ষেত্রে যেটি ঘটেছে, সেটাকে দায়িত্বে অবহেলা বলা যেতে পারে।
সময়ের আলো/আরবিএন