ফুটবল মাঠে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য যেমন আলোচনায় থাকেন, তেমনি পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কারণেও বারবার মানুষের নজর কাড়েন লামিন ইয়ামাল। বার্সেলোনার এই তরুণ তারকা জানিয়েছেন, তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রামের গল্প।
ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তরুণ প্রতিভা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন লামিন ইয়ামাল। তবে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও তিনি কখনো ভুলে যাননি নিজের শিকড়। খ্যাতির আগে তার জীবন ছিল খুবই সাধারণ। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি, যেখানে পরিবারের ত্যাগই ছিল তার এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তি।
ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ের আগে ইয়ামাল আবারও আলোচনায় এসেছেন মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য নয়, বরং পরিবারের প্রতি তার আবেগপূর্ণ কথার কারণে। একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারে বার্সেলোনার ১০ নম্বর জার্সিধারী এই খেলোয়াড় তার দাদি ফাতিমার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। মরক্কো থেকে স্পেনে এসে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ফাতিমার সংগ্রামের গল্প আজও ইয়ামালকে অনুপ্রাণিত করে।
পরিবারের সুখই ইয়ামালের সবচেয়ে বড় অর্জন
বর্তমানে ফুটবল থেকে পাওয়া সাফল্য ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করলেও ইয়ামাল বলেন, বছরের পর বছর কষ্টের পর পরিবারের মানুষদের ভালো থাকতে দেখা তার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বার্সেলোনার রোকাফোন্ডা এলাকার সাধারণ পরিবেশে বড় হয়েছেন ইয়ামাল। মাতারো, কাতালোনিয়ার এই শ্রমজীবী এলাকাটি এখনও তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি গোল উদযাপনের সময় হাতের বিশেষ ভঙ্গির মাধ্যমে তিনি ওই এলাকার পোস্টাল কোডকে স্মরণ করেন— যা তার শিকড়ের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।
বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমি থেকে উঠে এসে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মূল দলে অভিষেক হয় ইয়ামালের। পরে তিনি এসপ্লুগেস দে লোব্রেগাতে চলে গেলেও পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবসময়ই গভীর রয়েছে।
‘ফান্ডাসিয়ন হোসে রামোন দে লা মোরেনা’ পডকাস্টে ইয়ামাল বলেন, পরিবারের মানুষদের জন্য স্থিতিশীল জীবন তৈরি করাই সবসময় তার অন্যতম বড় প্রেরণা ছিল।
তিনি বলেন, আমি যখন দেখি আমার মা খুশি, আমার ছোট ভাই এমন শৈশব পাচ্ছে যা আমি পেতে চেয়েছিলাম— তখনই আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই।
ইয়ামাল আরও বলেন, তার বাবা নিজের ঘরে শান্তিতে আছেন, দাদি নিজের ঘরে ভালো আছেন এবং মা তার প্রয়োজনীয় সবকিছু পাচ্ছেন— এটাই একজন সন্তানের চাওয়ার সর্বোচ্চ বিষয়।
বর্তমানে ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই বার্সেলোনার একটি অভিজাত এলাকায় থাকেন। আর দাদি ফাতিমা এখনও রোকাফোন্ডাতেই থাকেন, যেখানে তার নাতি তার জন্য একটি বাড়ি কিনে দিয়েছেন।
দাদি ফাতিমার সংগ্রামের আবেগঘন গল্প
ইয়ামালের বলা গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তার দাদি ফাতিমার সংগ্রামের কাহিনি। পরিবারের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে তিনি একাই মরক্কো ছেড়ে স্পেনে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ইয়ামাল তার বাবার শৈশবের কথা স্মরণ করে বলেন, তার বাবা মাত্র তিন বছর বয়সে স্পেনে আসেন। তার মা-ও খুব অল্প বয়সে স্পেনে এসেছিলেন।
তিনি জানান, পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া যাত্রাটি শুরু করেছিলেন তার দাদি ফাতিমা। তিনি একাই বাসে করে মরক্কো থেকে স্পেনে পৌঁছান।
ইয়ামাল বলেন, প্রথমে আমার দাদি এসেছিলেন। তিনি একাই এসেছিলেন। বাসে লুকিয়ে উঠেছিলেন, আলহেসিরাসে থেমেছিলেন, পরে গ্রানাদা হয়ে শেষ পর্যন্ত মাতারোতে পৌঁছেন।
স্পেনে পৌঁছানোর পর ফাতিমা দ্রুত পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে আনার চেষ্টা শুরু করেন। ইয়ামাল জানান, তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করতেন, যাতে মরক্কোতে থাকা ছেলে ও মেয়েকে স্পেনে নিয়ে আসতে পারেন।
তিনি বলেন, তিনি সকাল, বিকেল, রাত—সব সময় কাজ করতেন, যাতে আমার বাবা আসতে পারেন। পর্যাপ্ত টাকা জমানোর পর তিনি একজন নারীকে টাকা দিয়ে তাদের স্পেনে নিয়ে আসেন।
সংগ্রামী শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করলেন ইয়ামাল
ইয়ামাল তার মায়ের স্পেনে আসার গল্প এবং ছোটবেলার আর্থিক সংকটের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি জানান, তার মা নিরক্ষীয় গিনি থেকে দাদার সঙ্গে বার্সেলোনায় এসেছিলেন। পরে তার বাবা-মায়ের পরিচয় হয় এবং তারা একসঙ্গে জীবন শুরু করেন। তবে জীবন সহজ ছিল না।
ইয়ামাল বলেন, তার মা অল্প বয়সে গর্ভবতী হওয়ার পর পরিবারকে অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। তারা অন্য তরুণ বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি আবাসনে থাকতেন, যেখানে সবাই মিলে খাবার পেতেন।
তিনি বলেন, আমি সেখানেই বড় হয়েছি। এটা এমন একটি জায়গা ছিল, যেখানে সবাইকে খাবার দেওয়া হতো।
পরবর্তীতে পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। অনেক সময় পরিচিত মানুষের সাহায্য নিয়ে থাকতে হয়েছে বলেও জানান ইয়ামাল।
তিনি বলেন, এরপর এমন সময়ও গেছে, যখন কোনো বন্ধুর বাড়িতে একটি ঘরে থাকার সুযোগ পেয়েছি।
পরবর্তীতে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। ইয়ামাল জানান, তার বাবা দাদির সঙ্গে থাকতে চলে যান এবং তিনি মায়ের সঙ্গে গ্রানোয়েলসে চলে যান।
কঠিন সেই সময়গুলো কখনো লুকাননি ইয়ামাল। বরং তিনি বারবার বলেছেন, বাবা-মা ও দাদা-দাদির ত্যাগই তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ