ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের সন্ধানে একের পর এক অভিযান চালাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। অভিযানে তাদের ফ্ল্যাট, ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার হচ্ছে বিলাসবহুল নানা পণ্যসামগ্রী। তবে আদালতের নির্দেশে সম্পদ জব্দ হলেও রিসিভার নিয়োগের প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় সেগুলোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে আদালতের জব্দাদেশ কার্যকর হলেও বাস্তবে সম্পদের ভোগদখল বহাল রয়েছে অবৈধ উপায়ে সেগুলোর মালিক হওয়া ব্যক্তিদের হাতেই।
দীর্ঘ ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকারের মদদপুষ্ট হয়ে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান দলটির প্রায় সব শীর্ষ নেতা, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী ও এমপি। অনেকে আছেন জেলে। দেশের ভেতরেও আত্মগোপনে আছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া অনেক নেতাকর্মী।
তড়িঘড়ি করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের অধিকাংশই স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালেই তারা মোটা অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার করেন। আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য প্রভাবশালীদের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তির খোঁজ নিতে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত এক বছরে আওয়ামীপন্থি সম্পদশালীদের দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করে দুদক। অন্যদিকে আদালতের নির্দেশে সিআইডি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১৫ মাসে ক্রোক করে ৩৫০ কোটি টাকার সম্পদ।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেসব মন্ত্রী, এমপি, ব্যবসায়ী, আমলা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলীয় নেতাকর্মী বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হন ৫ আগস্টের পর তাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ তালিকা তৈরি করে। তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে সিআইডি।
অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ শনাক্ত করতে সিআইডি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রি অফিস, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে চিঠি পাঠায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া তথ্য ও প্রমাণাদি যাচাই-বাছাইয়ের পর সম্পদ জব্দের জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানায় এবং পরে আদালতের আদেশ অনুযায়ী তা কার্যকর করে সংস্থাটি।
এরই ধারাবাহিকতায় সিআইডি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ৩৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ ও তহবিল জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করে। জব্দ করা সম্পদের মধ্যে ৩৮ হাজার ৫৯৭ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ২২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একই সময়ে ৪২১টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। ওইসব হিসাবে প্রায় ৩২ কোটি ৯০ লাখ টাকা জমা ছিল। বাজেয়াপ্ত সম্পদের তালিকায় আরও রয়েছে ৩৫০ শতাংশ জমি, ২০টি ফ্ল্যাট, ১১টি কোম্পানির শেয়ার এবং ২৩টি যানবাহন। এগুলোর সম্মিলিত মূল্য ২৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে দুর্নীতির মূল উৎপাটনে জিরো টলারেন্স নীতিতে হাঁটছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি, সিনিয়র নেতা, আওয়ামী ঘরনার ব্যবসায়ী ও আমলাদের দুর্নীতির শেকড়ের মূল উৎপাটনের টার্গেট নিয়েছে দুদক। ইতিমধ্যে সংস্থাটি আদালতের আদেশে তাদের ফ্ল্যাট, ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাচ্ছে। এসব অভিযানে বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রীসহ ফ্ল্যাট ও ভবন নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে সংস্থাটি। দুদক গত এক বছরে আওয়ামীপন্থি সম্পদশালীদের দেশে-বিদেশে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় দুদক। সাইফুজ্জামান চৌধুরী বর্তমানে বিদেশে পলাতক। আর জিয়াউল আহসান কারাগারে বন্দি।
অবশ্য দুদক বলছে, তারা সবসময়ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। এখানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বলে কোনো ইস্যু নেই। যে বা যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের আইনের আওতায় আনাই দুদকের কাজ। কোনো দলমত বিবেচনা করে দুদক কাজ করে না। যেহেতু আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে দলটির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও শীর্ষ নেতারা এবং আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী ও আমলাদের বিরুদ্ধে খোঁজখবর নিচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।
এদিকে দুদকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত বিচারিক আদালতে দুদকের মোট মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ১১১টি। এর মধ্যে ঢাকায় ৯৪১টি ও ঢাকার বাইরে ২১৭০টি। জুন মাসে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে ঢাকায় ৮টি ও ঢাকার বাইরে ১৭টি। জুন মাস পর্যন্ত পেন্ডিং মামলা রয়েছে দুদকের দায়ের করা ৩ হাজার ১১১টি ও বিলুপ্ত ব্যুরোর ৩২৭টি। এ হিসাবে মোট পেন্ডিং মামলা ৩ হাজার ৪৩৮টি মামলা।
প্লট বরাদ্দের দুর্নীতির অভিযোগে গত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পৃথক ৬টি মামলা করে দুদক। এ মামলাগুলোয় শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকসহ অন্যদের আসামি করা হয়। এ ছয় মামলার মধ্যে তিনটির রায় হয়। গত বছরের ২৭ নভেম্বর দুদকের মামলায় ঢাকার পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্পে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির পৃথক তিন মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭ বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। পৃথক তিন মামলায় আসামির সংখ্যা ৪৭। তবে ব্যক্তি হিসাবে এ সংখ্যা ২৩।
শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়া অপর ২০ আসামি হলেন সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) শফি উল হক, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মাদ সালাউদ্দিন প্রমুখ। আসামিদের মধ্যে একমাত্র মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গ্রেফতার আছেন।
লাখ কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধান
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার [প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা] পাচারের অভিযোগ এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে ৮০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শেখ মুজিবের জন্মশত বার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ পালন এবং শেখ মুজিবের ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণ করে অর্থ অপচয়, ক্ষতিসাধনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাসহ অন্যান্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে দুদক।
প্রভাশালীদের বিরুদ্ধে যত মামলা
দুদুক যেসব প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠা এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তি ও টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থপাচার এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড ও কানাডায় বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করার অভিযোগও রয়েছে।
সম্পদ জব্দ আদেশের পরও ঝুলে আছে রিসিভার নিয়োগ
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং আওয়ামী সুবিধাভোগী পলাতকদের দেশে-বিদেশে রয়েছে বিপুল সহায়-সম্পদ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। হাসিনা সরকারের পতনের পর এসব নগদ অর্থ ও সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে জব্দ করা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মধ্যে দেশেই রয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ। আর এর মধ্যে ছয় হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে।
তবে এই বিপুল সম্পদের বেশির ভাগেরই রিসিভার নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। ফলে শেখ হাসিনার পরিবার, এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগীরা এখনো এসব সম্পদের সুফল ভোগ করছেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, সম্পদ জব্দ করতে হলে আদালতের আদেশের প্রয়োজন হয়। আদালতের আদেশের পর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা জব্দকৃত সম্পদের রিসিভার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন।
হাসিনা সরকারের পতনের পর দুর্নীতির অভিযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের আদেশ দেন আদালত। নিয়ম অনুযায়ী, এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও আয় সংগ্রহের জন্য রিসিভার নিয়োগ করার কথা থাকলেও প্রশাসনিক ও আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে একদিকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্নীতিবাজরাই তাদের অবৈধ সম্পদ কৌশলে ভোগ করছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি