কলড্রপ, নেটওয়ার্ক ভোগান্তি, ইন্টারনেটের দাম বৃদ্ধি ও ইন্টারনেটের ধীরগতি মোবাইলসেবার অন্যতম চিহ্নিত সমস্যা। এসব সমস্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত বিটিআরসিতে অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। তবু যেন সবকিছু অজানা। তাই এবার মোবাইলসেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
এ লক্ষ্যে আগামী ১৯ আগস্ট একটি গণশুনানির আয়োজন করেছে সংস্থাটি। এর আগে ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৬টি গণশুনানি করেছে বিটিআরসি। এসব শুনানিতে মোবাইলসেবার নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে ২৯৫৩৯টি অভিযোগ করেন গ্রাহকরা।
এসব অভিযোগের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল কলড্রপ, ইন্টারনেটের ধীরগতি এবং বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন সংক্রান্ত ও ইন্টারনেট সেবার মানসংক্রান্ত। নেটওয়ার্ক কভারেজ, মোবাইল ডেটার মূল্য, ফোর-জি নেটওয়ার্ক কভারেজ, মোবাইল টাওয়ারের সমস্যা, জরুরি রিচার্জ সুবিধা সংক্রান্ত, নেটওয়ার্ক দুর্বলতা, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভাস) চালু করে টাকা কেটে নেওয়া, কলরেট ও ডেটা প্যাকের মূল্য, সিম রিপ্লেস ফিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ তুলে ধরেন গ্রাহকরা। এ ছাড়া বন্ধ সিমের মালিকানা বদলে যাওয়ার ভোগান্তি ও এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার) সংক্রান্ত সম্ভাব্য জটিলতার কথা জানান গ্রাহকরা।
অন্যদিকে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে ছয়টি গণশুনানি হলেও এখনও মোবাইলসেবায় এসব সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। সমস্যার সমাধানে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাই আবারও গ্রাহকদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করতে যাচ্ছে বিটিআরসি।
বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, টেলিযোগাযোগ সেবা-সংক্রান্ত গ্রাহকদের অভিযোগ, মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের জন্য আগামী ১৯ আগস্ট একটি গণশুনানির আয়োজন করেছে বিটিআরসি। ফলে টেলিযোগাযোগ সেবাগ্রহীতা এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রাহকদের অভিযোগ ও মতামতের ভিত্তিতে টেলিযোগাযোগ সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে বিটিআরসি।
গণশুনানিতে উপস্থিত থাকবেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) ও অন্যান্য টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তারা গ্রাহকদের অভিযোগ শুনবেন এবং সংশ্লিষ্ট সেবা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া প্রদান করবেন। গণশুনানিটি অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে আয়োজন করা হয়েছে। আগ্রহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে নির্ধারিত অনলাইন নিবন্ধন ফরমে তাদের অভিযোগ, প্রশ্ন ও মতামত জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে বিটিআরসি। প্রাপ্ত আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীদের ই-মেইল অথবা এসএমএসের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানাবে বিটিআরসি।
এর আগে ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকার বিটিআরসি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম গণশুনানি। এ সময় ১০৫০টি অভিযোগ করেছিলেন অংশগ্রহণকারীরা। অভিযোগগুলোর মধ্যে কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট এবং বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন-সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখযোগ্য ছিল। এরপর ২০১৯ সালের ১২ জুন রাজধানীর আইইবিতে (ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ) অনুষ্ঠিত হয়েছিলো দ্বিতীয় গণশুনানি।
এই শুনানিতে শতাধিক অভিযোগ পাওয়া যায়, যার অধিকাংশই ছিল কল ড্রপ ও ইন্টারনেট সেবার মানসংক্রান্ত। এরপর ২০২১ সালের ২২ আগস্ট কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় গণশুনানি। এ গণশুনানিতে ২৩,০১৬টি অভিযোগ নিবন্ধিত হয়েছিলো। ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে শতাধিক নাগরিক এতে অংশগ্রহণ করেন। নেটওয়ার্ক কভারেজ, ইন্টারনেটের গতি এবং মোবাইল ডেটার অতিরিক্ত মূল্য ছিল এ শুনানির প্রধান আলোচ্য বিষয়।
এরপর ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল চতুর্থ গণশুনানি। এ সময় ৮৪৮টি অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। অভিযোগগুলোর মধ্যে কল ড্রপ, ৪-জি নেটওয়ার্ক কভারেজ এবং মোবাইল টাওয়ারের সমস্যা-সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখযোগ্য ছিল। এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকার বিটিআরসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পঞ্চম গণশুনানি। এই শুনানিতে কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি, মোবাইল অপারেটরদের সেবা এবং জরুরি রিচার্জ সুবিধা-সংক্রান্ত বিষয়সহ ৩,০২৫টি অভিযোগ করেছিলেন গ্রাহকরা।
সবশেষ ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর বিটিআরসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এই খাত-সংশ্লিষ্ট প্রায় দেড় হাজার অভিযোগ জমা পড়েছিল। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা শুনানিতে গ্রাহকরা নেটওয়ার্ক দুর্বলতা, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভাস) চালু করে টাকা কেটে নেওয়া, কলরেট ও ডেটা প্যাকের মূল্য ও সিম রিপ্লেস ফিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। এ ছাড়া বন্ধ সিমের মালিকানা বদলে যাওয়ার ভোগান্তি ও এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার) সংক্রান্ত সম্ভাব্য জটিলতার কথা জানান গ্রাহকরা।
তবে গত ছয় শুনানিতে প্রায় একই রকম অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। সমস্যাও চিহ্নিত। কিন্তু বিগত ১০ বছরেও এ সব সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো পদক্ষেপ কারও নজরে পড়েনি। যে কারণে এই গণশুনানিকে শুধু বিটিআরসির নিয়ম রক্ষার শুনানি বলে মনে করছে গ্রাহক স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, এই গণশুনানি শুধু মাত্র বিটিআরসির নিয়ম রক্ষার শুনানি। যেখানে জনস্বার্থ উপেক্ষিত- সেই গণশুনানিতে অংশ নিয়ে আমরা বিটিআরসির নিয়ম রক্ষার ভাগিদার হতে চাই না। তাই এই গণশুনানিতে আমরা অংশ নিতে চাচ্ছি না।
তিনি বলেন, এখানে সবার কথা বলার সুযোগ নেই। গ্রাহকরা যদি তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারত তা হলে অভিযোগের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যেত। এই সমস্যা সমাধানে বিটিআরসির কোনো সক্ষমতা নেই।
এ বিষয়ে কথা বলতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারীকে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি।
তবে অপারেটরদের দাবি বিগত শুনানিতে যেসব সমস্যার কথা গ্রাহকরা বলেছিল তার সবই সমাধান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট ও রেগুলেটরি অফিসার ব্যারিস্টার সাহেদ আলম সময়ের আলোকে বলেন, টেলিকম আইন এবং নিয়ম অনুযায়ী বিটিআরসি নিয়মিত গণশুনানির আয়োজন করে থাকে। গণশুনানিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগগুলো দ্রুত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা সবসময় গ্রাহকের প্রতিটি অভিযোগকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখি।
তিনি বলেন, টেলিযোগাযোগ সেবা একটি জটিল প্রযুক্তিনির্ভর সেবা। এই সেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। এ কারণেই অন্যান্য দেশের মতো সেবার ন্যূনতম মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি নির্ধারণ করে থাকে এবং সব মোবাইল অপারেটর সেই মান অনুসরণ করেই সেবা প্রদান করে।
সাহেদ আলম আরও বলেন, ওয়ারলেস নেটওয়ার্কিংয়ে সব সময়ই কিছু সমস্যা হয় এবং এগুলোর সমাধানও হয়। আগের গণশুনানিগুলোতে যে অভিযোগ পাওয়া গেছে আমরা কিন্তু সবগুলোরই সমাধান করেছি।
সময়ের আলো/আআ