খোল-করতালের ছন্দ, হরিনাম সংকীর্তনের ধ্বনি এবং হাজারো ভক্তের জয়ধ্বনিতে শুক্রবার উৎসবমুখর হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকা। শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা মহারাণীকে বহনকারী তিনটি সুবৃহৎ রথকে কেন্দ্র করে ভক্তদের প্রার্থনা, ফুলের অর্ঘ্য ও উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রা।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ এবং ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে ছিল আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য রথ শোভাযাত্রা, ভাগবত আলোচনা, হরিনাম সংকীর্তন, ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাট্য পরিবেশনা, শিশুদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত আলোচনা সভায় ধর্মীয় নেতারা সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের বার্তা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ধর্মের নামে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা যারা করে, তারা জাতি, ধর্ম ও ঈশ্বরের শত্রু।
তিনি বলেন, প্রকৃত ধর্ম মানুষকে বিভক্ত নয়, বরং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। নিজ নিজ ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করাই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি। একটি অশুভ মহল ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। এ ধরনের অপচেষ্টা রুখে দিতে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সব ধর্মাবলম্বীর সমান অধিকার রয়েছে এবং ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষার ভিত্তিতে বিভক্তির কোনো স্থান নেই।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। যারা এই সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তারা দেশের সার্বভৌমত্বের চেতনাকেই অস্বীকার করে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী বাসুদেব ধর এবং ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শ্রী জয়ন্ত কুমার দেব। এছাড়া স্বাগত বক্তব্য দেন ইসকন বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য শ্রী বিমলা প্রসাদ দাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বামীবাগ আশ্রমের অধ্যক্ষ ও ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ।
আলোচনা সভা শেষে বিকেল ৩টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বর্ণাঢ্য উল্টো রথ শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি পলাশী মোড়, জগন্নাথ হল, জাতীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, কার্জন হল, হাইকোর্ট, জাতীয় প্রেসক্লাব, মতিঝিল, শাপলা চত্বর, টিকাটুলি ও দয়াগঞ্জসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে শেষ হয়।
পুরো পথজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ। নারী, পুরুষ, শিশু থেকে প্রবীণ-সব বয়সী হাজারো মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নেন। কেউ রথে ফুল অর্পণ করে প্রার্থনা করেন, আবার কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বর্ণিল আয়োজন উপভোগ করেন। খোল-করতালের তালে ভক্তদের নৃত্য, ভজন ও সংকীর্তনে পুরো পরিবেশ প্রাণবন্ত ও আধ্যাত্মিক আবহে মুখর হয়ে ওঠে।
সময়ের আলো/আরবিএন