আসামি-অস্ত্র সবই মাঠে

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সংঘাতমুক্ত করতে এবার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের প্রচলিত ঘটনার

2026-07-28T00:43:35+00:00
2026-07-28T00:43:35+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আসামি-অস্ত্র সবই মাঠে
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সংঘাতমুক্ত করতে এবার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের প্রচলিত ঘটনার সঙ্গে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের পর লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, জেল পলাতক ৭ শতাধিক দাগি আসামি ও জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আশঙ্কার নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সে সঙ্গে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও প্রভাব বিস্তার করতে পারে এসব সংঘাত-সংঘর্ষে। তবে জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও এসব আশঙ্কা মোকাবিলায় পুলিশ সফল হবে বলে জানান দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা।

চলতি বছরের অক্টোবর থেকেই দেশে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, জুলাই বা আগস্ট মাসের মধ্যেই প্রথম ধাপের নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে প্রয়োজনবোধে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একই সঙ্গে আয়োজন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো ভূমিকার কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনেকটাই সংঘাতমুক্তভাবে আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। সেই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে বদ্ধপরিকর সংশ্লিষ্টরা। তবে মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিস্থিতি শঙ্কামুক্ত বলতে পারছেন না অপরাধ বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ স্বনামে না হলেও স্থানীয় নির্বাচনে তাদের অনেকেই অংশ নেবেন। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতাবলয়ের বাইরে থাকা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সহজেই মাঠ ছেড়ে দেবে না। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল পরিমাণ কালো টাকা থাকায় তারাও সহজে পিছপা হবে না। এ ক্ষেত্রে পেশিশক্তি প্রয়োগের ব্যাপক আশঙ্কা থাকবে। 

এ ছাড়া ক্ষমতাসীন বিএনপির অন্তর্কোন্দলের কারণেও সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৫৮ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, যাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন বিএনপি দলীয়। এসব হত্যাকাণ্ডের অর্ধেকই ঘটে অজ্ঞাতনামা আততায়ীর হাতে।

মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭ জন, মার্চে ১৭ জন, এপ্রিলে ৮ জন, মে মাসে ৬ জন এবং জুন মাসে সর্বাধিক ১৪ জন রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি খুন হন।

উদ্ধার হয়নি সহস্রাধিক অগ্নেয়াস্ত্র

অন্যদিকে প্রায় দুই বছর পরও দেশের থানাগুলো থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্রও স্থানীয় নির্বাচনে হুমকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে ব্যাপক জনরোষের শিকার হয় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা। ওই সময় পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়। 

এর মধ্যে এখনও উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩২৮টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩৩টি এসএমটির মতো সাব-মেশিনগান। এ ছাড়া রয়েছে এসএমজি ২২২টি, চায়না রাইফেল ১ হাজার ২টি, এসএমজি-টি ৩১টিসহ বিভিন্ন মডেলের অত্যাধুনিক অস্ত্র। এ ছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়ে যায় ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ।

হুমকি হতে পারে শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও

বিগত সরকার পতনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস হিসেবে পরিচিত আব্বাস আলী, শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুসহ আরও বেশ কয়েকজন। এদের অনেকেই আবার তাদের আগেকার অন্ধকার জগতে ফিরে গেছে। অনেকে দেশে-বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে অপরাধ জগৎ।

এসব সন্ত্রাসী সবসময়ই ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। যেকোনো ধরনের নির্বাচনে তাদের প্রচ্ছন্ন ভূমিকা অতীতেও লক্ষ করা গেছে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সেই আশঙ্কা রয়েছে বলে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এখনও অধরা ৭১৩ জন

এ ছাড়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের কারাগারগুলো থেকে ২ হাজার ২৩২ বন্দি পালিয়ে যায়। এর মধ্যে দুর্ধর্ষ অপরাধীও রয়েছে। পরে তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫১৯ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হলেও এখনও ফেরারি ৭১৩ জন। স্থানীয় নির্বাচনে এ অপরাধীদেরও ব্যবহার করার আশঙ্কা রয়েছে।

কারা অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগারের বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এ সময় নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬, শেরপুর থেকে ৫০০, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০, কুষ্টিয়ার কারাগার থেকে ১০৫ ও কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কারাগার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ বন্দি পালিয়ে যায়। এর বাইরে জামালপুর কারাগারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেখান থেকে বন্দি পালিয়ে যায়নি। সব মিলিয়ে দেশের কারাগার থেকে সে সময় ২ হাজার ২৩২ বন্দি পালিয়ে যায়।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো কখনোই শঙ্কামুক্ত ছিল না। এবার সেই শঙ্কা নতুন রূপ পাবে। স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাতময় রাজনীতির সঙ্গে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৫ আগস্টের পর লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া দাগি অপরাধী, জামিনে বের হয়ে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। 

সে সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, তাদের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক যদি ভোট দিতে না পারে তখন তারা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করে সেটাও নতুন আশঙ্কার জন্ম দেবে।


তবে এতসব আশঙ্কার মধ্যেও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়াটাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি। অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে এখনও সে ধরনের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। আমরা ইসির নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকি। তারা যে নির্দেশনা দেবে সেই হিসেবেই আমরা কাজ করব।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য হমকি হবে কি না- এ প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো ধরনের আনঅথরাউজড আর্মসই আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি। জাতীয় নির্বাচনের আগেও ওইসব অস্ত্র হুমকি ছিল। কিন্তু আমরা সেগুলো মোকাবিলা করেছি। এবারও আমরা তা করতে পারব। একই সঙ্গে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানান তিনি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   আসামি  অস্ত্র  মাঠ  স্থানীয় সরকার নির্বাচন 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: