৩৬৯০ কোটির মেগা প্রকল্প আনতে তৎপর সিন্ডিকেট

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে গতি আনতে প্রায় ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয়েছিল ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প।

2026-07-28T01:38:42+00:00
2026-07-28T01:38:42+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
পুরোনো প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত
৩৬৯০ কোটির মেগা প্রকল্প আনতে তৎপর সিন্ডিকেট
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১:৩৮ এএম 
কৃষি জমিতে আধুনিক যন্ত্র। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে গতি আনতে প্রায় ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয়েছিল ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প। কিন্তু প্রকল্পটি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়েও শেষ হয়নি। 

এখনও ৫২৮ কোটি ৬৫ লাখ ১৭ হাজার টাকার কাজ বাকি থাকলেও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব এক বছর ধরে ঝুলে আছে। প্রস্তাবে অনুমোদন মিললে আগামী এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে অসমাপ্ত কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে অসমাপ্ত প্রকল্পটি শেষ না করেই প্রায় ৩ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার নতুন আরেকটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা। এ উদ্যোগকে ঘিরে দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কৃষির আধুনিকায়নে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিন হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবে সে উদ্যোগ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘সমন্বিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ নামের ওই প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ সামনে আসার পর সাবেক একজন প্রকল্প পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা বরখাস্ত হন। তবে অনিয়মে জড়িত সংশ্লিষ্ট কৃষিযন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আড়াল করার পাশাপাশি রাঘববোয়াল আমলাদেরও সুরক্ষার চেষ্টা অব্যাহত।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর আগে শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের সব কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত কোটি টাকার অসমাপ্ত কাজ থমকে আছে, বিপাকে পড়েছেন প্রকল্পে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ধারাবাহিকতাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

তবে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপি (আরডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন মিললে প্রকল্পের অব্যয়িত ৫২৮ কোটি ৬৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা ব্যয় করে অসমাপ্ত কাজ শেষ করা হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেলে অবকাঠামো, কৃষিযন্ত্র বিতরণ এবং অন্যান্য অসমাপ্ত কার্যক্রম ঝুলে যাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সে কারণেই নতুন অর্থ বরাদ্দ নয়, বরং অব্যয়িত অর্থ ব্যবহার করে প্রকল্পটি যৌক্তিকভাবে শেষ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে মন্ত্রণালয়। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন মিললে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে অসমাপ্ত কৃষিযন্ত্র বিতরণ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রকল্পের বাকি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি চলমান দুর্নীতির তদন্তও অব্যাহত থাকবে, যাতে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। তাদের মতে, এই অর্থ ফেরত দিয়ে নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে চলমান প্রকল্প শেষ করাই রাষ্ট্রের জন্য বেশি যৌক্তিক।

প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. মঞ্জুর উল আলম দৈনিক সময়ের আলোকে জানান, গত ২৫ জুন প্রকল্পের মূল মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে প্রকল্পের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। তবে অব্যয়িত অর্থ এবং অসমাপ্ত কাজ থাকায় মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। 

তিনি জানান, প্রকল্পের মোট ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার মধ্যে ৫২৮ কোটি ৬৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা অব্যয়িত রয়েছে। এটি নতুন কোনো বরাদ্দ নয়; মূল প্রকল্পেরই অব্যবহৃত অর্থ। এ অর্থ দিয়ে অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পেলেই প্রকল্পটি আবার চালু করা সম্ভব হবে। 

তিনি জানান, প্রথমে দুই বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হলেও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর চলে গেছে। এখন লক্ষ্য হচ্ছে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর। তা হলে অন্তত এক বছরের মধ্যে অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় করে অসমাপ্ত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটির বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি যোগদানের পর পূর্ববর্তী অনিয়ম নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন কৃষি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং অডিট বিভাগ পৃথকভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তদন্তে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রকল্পে কম্বাইন হার্ভেস্টার বিতরণ নিয়ে যে বড় ধররের অনিয়ম হয়েছে, তার অন্যতম দিক ছিল আমদানির তুলনায় বেশি বিতরণ দেখানো। 

প্রকল্পের নথিপত্রে প্রকৃতপক্ষে যতগুলো কম্বাইন হার্ভেস্টার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি সংখ্যায় বিতরণ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, বাস্তবে নেই এমন মেশিনের বিতরণ কাগজে-কলমে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই মেশিনের বিপরীতে জালিয়াতি করে দুটি বা তিনটি বিল তৈরি করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এর ফলে একটি মেশিন বিতরণ হলেও নথিতে তা কয়েকবার দেখানো সম্ভব হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো মেশিন সরবরাহ বা বিতরণ না করেই সম্পূর্ণ ভুয়া বিল প্রস্তুত করে সরকারি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। 

প্রকল্প পরিচালক জানান যে, তারা এমন বিল পেয়েছেন যেখানে প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি তোলা হয়েছে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে। মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়েও এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জানান, অনিয়মের অভিযোগে ইতিমধ্যে ৯ জন কৃষি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের একজন সাবেক প্রকল্প পরিচালককেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে চলমান প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়িয়েই ‘টেকসই কৃষির জন্য কৃষি প্রকৌশল প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ নামে প্রায় ৩ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার ৫ বছরমেয়াদি নতুন আরেকটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ। এই কর্মকর্তারাই পুরোনো প্রকল্পটি বন্ধ করার পাঁয়তারা করছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে। গত ১২ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় প্রকল্পটি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের সাত মাস পর সংশোধনী প্রস্তাব জমা পড়ায় একে ‘বিধিবহির্ভূত’ দেখানো হয়। 

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বিলম্ব ছিল পরিকল্পিত। প্রকল্পটি বন্ধের এ প্রক্রিয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গত প্রায় ১ বছর ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, যা তাদের মানবেতর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা চলমান প্রকল্প বাদ দিয়ে নতুন প্রকল্প দ্রুত মাঠে আনার বিষয়ে তৎপর বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি যদিও এখনও কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন পর্যায়ে আসেনি। তবে প্রকল্পটি উপস্থাপনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, ৩ হাজার রাইস ট্রান্সপ্লান্টার এবং তিন হাজার রিপার বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

নতুন প্রকল্পে সারা দেশে সমানভাবে ৫০ শতাংশ ভর্তুকির প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী প্রকল্পে সমতলে ৫০ শতাংশ এবং হাওড়াঞ্চলে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হতো। প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পে ড্রোন প্রযুক্তি, আইওটিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা, সোলার ড্রিপ সেচসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি পরীক্ষণ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র শক্তিশালী করা, ফার্মশেড নির্মাণ এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।


সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, চলমান প্রকল্পে অনিয়মের বিচার ও অসমাপ্ত কাজ শেষ না করেই নতুন প্রকল্প নেওয়া কতটা যৌক্তিক। তবে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুর উল আলম এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে বলেন, বর্তমান প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ শেষ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ জানিয়েছেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে। যান্ত্রিকীকরণের আড়ালে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করা হবে। পুনর্গঠিত দুদক কার্যক্রম শুরু করলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   ৩৬৯০ কোটি  মেগা প্রকল্প  তৎপর  সিন্ডিকেট  কৃষি যান্ত্রিকীকরণ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: