ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করবেন তা আগে থেকে কেউ অনুমান করতে পারে না। এই স্বভাব নিয়ে তিনি নিজেই গর্ব করেন। তার কথায়, এ ধরনের অনিশ্চয়তা শত্রু-মিত্র সবাইকে একই রকম অবস্থায় রাখে। গত ১৩ মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া, জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় কমান্ডো পাঠানো এসব ঘটনাই তার দাবি অনুযায়ী প্রমাণ করে, সামরিক বিষয়ে তিনি কতটা বেপরোয়া হতে পারেন; যা তার আগে কোনো প্রেসিডেন্ট করার সাহস করেননি।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী একসময় ট্রাম্প বলতেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তিনি শুধু নিজের বিবেকের কাছেই দায়বদ্ধ। কিন্তু এখন তাকে এমন এক নেতা মনে হচ্ছে, যিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। আর ধীরে ধীরে সেই যুদ্ধই তার প্রেসিডেন্সিকে গ্রাস করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ ও সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি যে, তার ক্ষমতারও সীমা রয়েছে। পাঁচ মাস পরেও সেই লক্ষ্যগুলো অধরাই রয়ে গেছে।
একসময় আশা করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও বাইরে থেকে সরকার পাল্টে মার্কিনপন্থি শাসন বসাতে পারবেন। কিন্তু এখন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট বলছে, সেই কৌশল কাজ করবে না। তাই বড় ধরনের হামলা চালাতেও ইতস্তত করছেন তিনি।
পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে পড়ছে। তেলের দাম বাড়ছে, শেয়ারবাজার নামছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণও করতে পারছেন না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, লোহিত সাগরের পথও হুমকির মুখে। আগে তিনি ইরানের তেলকেন্দ্র খারগ দ্বীপ বা ইউরেনিয়াম ভান্ডার দখলের হুমকি দিলেও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো ইচ্ছা তার নেই। তার সহযোগীদের মতে, এই ব্যর্থতাগুলো তাকে ক্রমশ হতাশ করে তুলছে আর তার স্বাভাবিক আচরণকে আরও খামখেয়ালি করে দিচ্ছে।
সেই খামখেয়ালির নজির গত সপ্তাহেও দেখা গেছে। প্রেসিডেন্টের জ্বালানিমন্ত্রী সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক চুক্তি করলেন। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প নিজেই সেটি বাতিল করে দেন। তার শর্ত ছিল সৌদি আরবকে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ যোগ দিতে হবে।
আঠারো মাসের আলোচনার পর তৈরি হওয়া চুক্তি এভাবে ভেস্তে যাওয়ায় সৌদি কর্মকর্তারা পুরোপুরি হতবাক হয়েছেন। পশ্চিম এশিয়া বিশেষজ্ঞ সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প সৌদিদের দূরে সরিয়ে নেতানিয়াহুকে খুশি করেছেন এবং ইরানকে বড় সুযোগ করে দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা যায় না, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবেই।’
এরপর আরও এক বড় চুক্তি বাতিল করেন। সেটি হলো কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের গর্ডি হাও সেতু নির্মাণের সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প। কানাডীয় পণ্যের ওপর পঞ্চাশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় তা পুরোনো চুক্তির লঙ্ঘন বলেই মনে করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই কানাডা এবার সেতুর উদ্বোধনে আমেরিকানদের আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেবে।
দেশের ভেতরেও একই ঘটনা ঘটল। দীর্ঘ আলোচনার পর দ্বিদলীয় ভিত্তিতে আবাসন বিল তৈরি হলেও ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে সই করতে অস্বীকার করেন, কারণ তার প্রথম অগ্রাধিকার ভোটাধিকার সংস্কার বিল। ফলে দলটি বড় কোনো সাফল্যের কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ হারায়।
ট্রাম্পের কাছের লোকরা বলছেন, এই আচরণের পুরো কারণ ইরান যুদ্ধ না হলেও বড় অংশটি তারই প্রভাব। ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোসের জরিপ বলছে, মাত্র ২৯ শতাংশ নাগরিক যুদ্ধ পরিচালনায় তার ভূমিকাকে সমর্থন করছেন। তার নিজ দলের অনুগত নেতা মাইক জনসনও বলছেন, ‘এটা আমাদের শেষ করতেই হবে।’ লক্ষ্য পূরণের কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে প্রেসিডেন্টের সামনে এখন কোনো স্পষ্ট পথ নেই। এখন তিনি সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন।
মাত্র এক মাস আগেও তিনি আশাবাদী ছিলেন। ১৭ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে ইরানের সঙ্গে চৌদ্দ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন। যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল। তখন তার দাবি ছিল, বড় হামলার হুমকির কারণেই ইরান পিছু হটেছে এবং তার নেতারা বুঝে গেছে তাদের জন্য কী ভালো। কিন্তু সেই চুক্তি টিকল মাত্র দুই সপ্তাহ।
ধারণা করা হয়, যে ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনা করছিলেন তাদের সঙ্গে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং বাহিনীটি হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ম না মানা জাহাজে হামলা চালায়। ট্রাম্পের মতে, ইরানের রাজনীতিকরা বিদেশে আটকে থাকা তহবিল ছাড়া পেতে চায়, কিন্তু বিপ্লবী গার্ড নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী।
এখন ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ। আরও বড় হামলা, আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা অথবা বিজয় ঘোষণা করে ফিরে আসা। গত কয়েক সপ্তাহে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি পথেই বিপদ রয়েছে।
গত সপ্তাহে বড় হামলার হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে সরে আসেন। কারণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামো ধ্বংস করলে সাধারণ মানুষ মারা যাবে, দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে; ট্রাম্প একসময় প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন যে ইরানিদের রক্ষা করবেন। এমনকি এ ধরনের পদক্ষেপ যুদ্ধাপরাধও হতে পারে। প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেব না।’
আসল কারণ হয়তো অন্য কিছু। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের অর্ধেকেরও বেশি ইতিমধ্যে ব্যবহার হয়ে গেছে। টানা ১৩ রাতের হামলার পর এখন তা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। আর এই ঘাটতির সুযোগ নিতে পারেন রাশিয়ার পুতিন বা চীনের শি জিনপিং। কারণ নিজেদের অঞ্চলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
অপরদিকে নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ করা যায়। কিন্তু তার প্রভাব পড়তে সময় লাগে। ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে তিনি ভেবেছিলেন ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। কিন্তু আট বছর পরও তা টিকে আছে। আর অবরোধ টিকিয়ে রাখতে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন, যা ব্যয়বহুল এবং সৈন্য ও মিত্রদের ঝুঁকি বাড়ায়।
তৃতীয় পথটি হলো নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করে ফিরে আসা। এক মাস আগে তিনি তাই করতে চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানোর জন্য। কিন্তু তাতেও মূল্য দিতে হবে। যদি ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যেতে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় তবে যে কারণে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তা পূরণ হবে না। এটি প্রমাণ করবে, তার ক্ষমতারও সীমা আছে, যা তিনি শুরুতে ভাবতেও চাননি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি