ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে চীন। সম্প্রতি প্রকাশিত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ভারতের সীমান্তমুখী দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১১টি অত্যাধুনিক জে-২০‘মাইটি ড্রাগন’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে বেইজিং। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং ভারত সীমান্তে চীনের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের নিয়মিত অপারেশনের ইঙ্গিত।
স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের হোটান বিমানঘাঁটিতে সাতটি এবং তিব্বতের দামশুং বিমানঘাঁটিতে চারটি জে-২০ যুদ্ধবিমান অবস্থান করছে। হোটান বিমানঘাঁটি লাদাখের লেহ থেকে প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটার দূরে এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর কৌশলগত দৌলত বেগ ওল্ডি (ডিবিও) বিমানঘাঁটি থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অন্যদিকে, দামশুং বিমানঘাঁটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং সীমান্তের বিপরীতে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই ঘাঁটির ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সীমান্তে কোনো সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এসব ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।
কেন জে-২০ এত গুরুত্বপূর্ণ?
জে-২০ হলো চীনের প্রথম দেশীয়ভাবে নির্মিত পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান। উন্নত নকশা, রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা, আধুনিক সেন্সর, দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতা এবং উচ্চগতির কারণে এটি বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে জে-২০-এর রাডার প্রতিফলন অত্যন্ত কম। ফলে প্রচলিত রাডার ব্যবস্থায় এটিকে শনাক্ত করা কঠিন। এই বৈশিষ্ট্য শত্রু আকাশসীমায় প্রবেশ করে আঘাত হানার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা দেয়।
ভারতের জন্য কেন উদ্বেগ?
বর্তমানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে কোনো পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান নেই। ভারতের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান ফরাসি নির্মিত রাফাল হলেও সেটি স্টেলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন নয়। এছাড়া সুখোই-৩০ এমকেআই, মিরাজ-২০০০ ও মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানও চতুর্থ প্রজন্ম বা তার উন্নত সংস্করণের প্ল্যাটফর্ম।
ভারতের নিজস্ব স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এএমসিএ) এখনও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলেও এটি কার্যকরভাবে বিমানবাহিনীতে যুক্ত হতে আরও অন্তত এক দশক সময় লাগতে পারে।
ফলে সীমান্তে চীনের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউস্পেস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক যুদ্ধবিমানচালক সমীর জোশী বলেন, ভারতের উত্তর সীমান্তে জে-২০-এর নিয়মিত উপস্থিতি এখন নতুন বাস্তবতা। তার মতে, ভারতীয় বিমানবাহিনীকে দ্রুত স্টেলথ বিমান শনাক্ত করতে সক্ষম উন্নত রাডার, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে, ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক উপপ্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) নর্মদেশ্বর তিওয়ারি বলেন, বছরে শতাধিক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান উৎপাদনের সক্ষমতা চীনের শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার প্রতিফলন। তার ভাষায়, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকেই চীন বিমানশক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে এবং আজ তার ফল পাচ্ছে।
দ্রুত বাড়ছে চীনের জে-২০ বহর
প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে চীনের হাতে প্রায় ৫০টি জে-২০ ছিল। ২০২২ সালের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০-তে পৌঁছে। বর্তমানে বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে চীনের হাতে ৩০০ থেকে ৫০০টি জে-২০ রয়েছে এবং বছরে প্রায় ১২০টি নতুন যুদ্ধবিমান উৎপাদন করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনিস্টিটিউট (আরইউএসআই) পূর্বাভাস দিয়েছে, বর্তমান উৎপাদন হার অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের জে-২০ বহর এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।
ভারতের বর্তমান সক্ষমতা
ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে বর্তমানে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা দুটি স্কোয়াড্রনে মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি রাফাল কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং বিমানবাহিনীর জন্য আরও ১১৪টি রাফাল কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এর পাশাপাশি ভারতের বহরে ২৬০টিরও বেশি সুখোই-৩০ এমকেআই, মিরাজ-২০০০, মিগ-২৯ এবং দেশীয় তেজস যুদ্ধবিমান রয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিই স্টেলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন নয়।
বাড়ছে কৌশলগত প্রতিযোগিতা
বিশ্লেষকদের মতে, হিমালয় সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, উন্নত যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে দুই দেশই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ভারতের সীমান্তের এত কাছে জে-২০ যুদ্ধবিমান মোতায়েনকে অনেক বিশ্লেষক ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন। যদিও এ বিষয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ