মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক বলেছেন, মার্কিন বাহিনী মহাকাশে কিছু ‘স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ বা মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র মোতায়েন করেছে।
এসব অস্ত্রের সাহায্যে মহাকাশে থাকা শত্রু দেশের স্যাটেলাইটের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্যাটেলাইটগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো জানায়নি, ঠিক কী ধরনের অস্ত্র মহাকাশে পাঠানো হয়েছে, কতগুলো পাঠানো হয়েছে বা সেগুলো কোথায় রয়েছে।
এই ঘোষণা চীন ও রাশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে মহাকাশ ভবিষ্যতে আরও বড় সামরিক প্রতিযোগিতার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
মহাকাশের এসব অস্ত্র কী করতে পারে?
মহাকাশে থাকা অস্ত্রের সাহায্যে অন্য দেশের স্যাটেলাইটের কাজ ব্যাহত করা সম্ভব হতে পারে।
যেমন— স্যাটেলাইটের যোগাযোগে বাধা দেওয়া, রেডিও সিগন্যাল বন্ধ বা দুর্বল করা, তথ্য আদান-প্রদানে সমস্যা তৈরি করা, কোনো স্যাটেলাইটের কার্যক্রম নজরদারি করা এবং প্রয়োজন হলে শত্রুর মহাকাশ প্রযুক্তিকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা
বর্তমানে সামরিক ও বেসামরিক, দুই ক্ষেত্রেই স্যাটেলাইট খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিপিএস, মোবাইল ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবহাওয়ার তথ্য, নেভিগেশন এবং গোয়েন্দা তথ্যের জন্য স্যাটেলাইটের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেস কন্ট্রোল’ ধারণার মূল লক্ষ্য হলো নিজেদের মহাকাশ ব্যবস্থা নিরাপদ রাখা এবং শত্রুর মহাকাশ সক্ষমতা দুর্বল করা।
কী ধরনের অস্ত্র হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অস্ত্রগুলোর কিছু ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও জ্যামিংয়ের প্রযুক্তি হতে পারে। জ্যামিংয়ের মাধ্যমে কোনো স্যাটেলাইটের সিগন্যালের সঙ্গে অন্য সিগন্যালের গোলমাল তৈরি করা হয়। এতে স্যাটেলাইট ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে বা তথ্য পাঠাতে পারে না।
এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে কোনো স্যাটেলাইটকে সরাসরি ধ্বংস করার প্রয়োজন হয় না।
তবে সরাসরি কোনো মহাকাশযান বা স্যাটেলাইটে আঘাত করে ধ্বংস করার মতো অস্ত্রও ভবিষ্যতে ব্যবহার করা হতে পারে। এ ধরনের অস্ত্রকে সাধারণভাবে ‘কাইনেটিক’ অস্ত্র বলা হয়।
এটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কোনো স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে তার হাজার হাজার টুকরো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব টুকরো অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে ধাক্কা লেগে আরও ক্ষতি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স কী?
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স দেশটির সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে নতুন শাখা। এটি ২০১৯ সালে গঠন করা হয়। এর প্রধান কাজ হলো মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা ও সুরক্ষা দেওয়া।
এর মধ্যে রয়েছে, সামরিক স্যাটেলাইট পরিচালনা ও সুরক্ষা, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালনা, জিপিএস ও অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা, মহাকাশে থাকা বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য মহাকাশ হুমকি শনাক্ত করা।
মহাকাশে অস্ত্র রাখা কি নিষিদ্ধ?
মহাকাশে সব ধরনের অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ নয়। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি অনুযায়ী, কোনো দেশ মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র বা ব্যাপক ধ্বংস করতে পারে এমন অস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে না।
চাঁদ বা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুতে সামরিক ঘাঁটি তৈরি এবং সেখানে অস্ত্র পরীক্ষা করাও নিষিদ্ধ। তবে পৃথিবীর কক্ষপথে সাধারণ বা প্রচলিত অস্ত্র রাখার বিষয়ে এই চুক্তিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই।
এ কারণে স্যাটেলাইটে আঘাত করতে পারে এমন অস্ত্র, জ্যামিং ব্যবস্থা, সাইবার প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ‘কাউন্টারস্পেস’ প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ দেশগুলোর রয়েছে।
চীন ও রাশিয়া কী বলছে?
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার সমালোচনা করেছে চীন ও রাশিয়া। চীন বলেছে, মহাকাশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা উচিত নয়। তারা মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
রাশিয়াও মহাকাশকে অস্ত্রমুক্ত রাখার পক্ষে কথা বলেছে। তবে একই সময়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চীন ও রাশিয়াও নিজেদের মহাকাশ সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
তাদের তৈরি বা পরীক্ষাধীন প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে, স্যাটেলাইট ধ্বংস করার সক্ষমতা, সিগন্যাল জ্যাম করার প্রযুক্তি, সাইবার হামলার ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইটের কাছাকাছি গিয়ে নজরদারি করতে পারে এমন মহাকাশযান।
চীন এমন একটি প্রযুক্তিও পরীক্ষা করেছে, যাকে ‘স্পেস টাগ’ বলা হয়। এর মাধ্যমে একটি স্যাটেলাইটকে ধরে অন্য কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
অন্য দেশগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে
শুধু যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াই মহাকাশে সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করছে না। ভারতও স্যাটেলাইট ধ্বংস করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। পাশাপাশি অন্য স্যাটেলাইটের কাছাকাছি গিয়ে কাজ করতে পারে এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে।
ফ্রান্সও মহাকাশে সামরিকভাবে কাজ করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মহাকাশে বিভিন্ন যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ইরান স্যাটেলাইট যোগাযোগে জ্যামিং ও ভুল তথ্য পাঠানোর প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইসরায়েলেরও শক্তিশালী সামরিক মহাকাশ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
মহাকাশ কি ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে?
মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নতুন কোনো বিষয় নয়। অনেক দেশই দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশকে নিজেদের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এবার প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা বলায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পর চীন ও রাশিয়াও নিজেদের মহাকাশ অস্ত্রের কথা প্রকাশ্যে জানাতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও মহাকাশে সামরিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বাড়াতে পারে।
এর ফলে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
সাধারণ মানুষের ওপর এর কী প্রভাব হতে পারে?
মহাকাশে যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব শুধু বড় দেশগুলোর ওপর পড়বে না। সারা বিশ্বের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জিপিএস, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বিমান চলাচল, নৌযান পরিচালনা এবং বিভিন্ন ধরনের নেভিগেশন ব্যবস্থায় স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই মহাকাশে বড় ধরনের সংঘাত হলে এসব সেবা ব্যাহত হতে পারে।
মহাকাশ এখন শুধু গবেষণা বা যোগাযোগের জায়গা নয়, এটি ধীরে ধীরে সামরিক প্রতিযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। আর এই প্রতিযোগিতা বাড়লে তার প্রভাব পৃথিবীর সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ