কারাবন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে দেশটির ক্ষমতাধর সেনাপ্রধান ব্যক্তিগত ‘প্রতিশোধপরায়ণতা’ চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার দুই ছেলে। একই সঙ্গে তাদের বাবার ওপর চলা কঠোর আচরণ ও কারাবাসের কারণে তাকে ‘ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে’ বলে তারা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারাগারে ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ যখন ক্রমশ বাড়ছে, ঠিক তখনই তার ছেলেরা এই অভিযোগ তুললেন।
কাশিম খান (২৭) এবং সুলাইমান খান (২৯) দুজনই তাদের বাবার মুক্তির পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছেন। ২০২৩ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি আছেন এবং দুর্নীতির অভিযোগে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
জেমিমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে ইমরান খানের প্রথম সংসারের এই দুই সন্তান লন্ডন থেকে ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান যে, তারা তাদের বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে ‘অত্যন্ত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তাকে যে ধরনের পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হয়েছে, তা একধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শামিল।
সুলাইমান বলেন, বাস্তবতা হলো, তিনি মানুষের সংস্পর্শহীন একটি ছোট্ট ৬ বাই ৮ ফুটের প্রকোষ্ঠে তালাবদ্ধ অবস্থায় আছেন। গত কয়েক মাস ধরে তাকে কোনো নতুন বই দেওয়া হয়নি এবং পরিবার বা কোনো নিরপেক্ষ চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে বা কথা বলতে দেওয়া হয়নি। সবকিছুর চেয়েও বড় কথা হলো, আমরা শুধু তার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই এবং নিশ্চিত হতে চাই যে তিনি ভালো আছেন।
ইমরান খানের ছেলেদের মতে, তাদের বাবার ওপর এই ‘নিষ্ঠুর’ আচরণের পেছনে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত ‘ক্ষোভ’ কাজ করছে বলে তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। ইমরান খান যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি আসিম মুনিরকে তার পদ থেকে মর্যাদাহানিকরভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন এবং দুজনের মধ্যকার এই তিক্ততা সর্বজনবিদিত। পরে ২০২৩ সালে আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধান করার পর ইমরান খানের ওপর নিপীড়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
সুলাইমান বলেন, এটা খুবই স্পষ্ট যে এটি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই পরিচালিত হচ্ছে এবং আসিম মুনিরের নির্দেশেই তার সঙ্গে এত কঠোর আচরণ করা হচ্ছে। গত এক বছরে আসিম মুনিরের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যিনি মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
কাশিম বলেন, কোনো পক্ষপাতহীন, নিরপেক্ষ চিকিৎসক দ্বারা আমাদের বাবার প্রকৃত শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এখনও কোনো পরিষ্কার চিত্র সামনে আনা হয়নি। আমাদের বিশ্বাস, তারা জেলের ভেতরে তাকে ধীরে ধীরে তিলে তিলে শেষ করার চেষ্টা করছে। যখনই আন্তর্জাতিক চাপ একটু কমে আসে, আমরা নিশ্চিত যে তারা তার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে এবং তাকে চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
এদিকে এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকার ইমরান খানের বিষয়ে করা এই অভিযোগগুলোকে ‘বানোয়াট অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের দাবি, তাকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই রাখা হয়েছে এবং তিনি ঘরের তৈরি খাবার, বাদাম, বোতলজাত পানি, ব্যায়ামের সরঞ্জাম, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ও নিয়মিত মেডিকেল চেকআপের সুবিধা পাচ্ছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, কারাবন্দি ওই ব্যক্তির ওপর কোনো ধরনের শাস্তিমূলক নির্জন কারাবাস, নিষ্ঠুরতা বা বঞ্চনা চালানোর অভিযোগ পাকিস্তান সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
ইমরান খানের ছেলেরা জানান যে তারা পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত উৎসুক হলেও, ভিসা আবেদন করার ৯ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের এখনও ভিসা দেওয়া হয়নি।
তারা জোরালোভাবে বলেন যে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রবেশ করার বা ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো আগ্রহ তাদের নেই।
সুলাইমান বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে পাকিস্তানের রাজনীতিতে জড়ানোর কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। আমাদের বাবা সবসময় বলতেন যে পাকিস্তানি রাজনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হলো এই বংশতান্ত্রিক স্বজনপ্রীতি; গত ৪০ বছর ধরে ক্ষমতা মাত্র দুটি পরিবারের হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ