ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনা ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন সরকারের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এসব অস্ত্র দ্রুত পুনরায় উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের আগে যে পর্যায়ে এসব অস্ত্রের মজুত ছিল, সেখানে ফিরতে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে।
তবে পেন্টাগন বরাবরই অস্ত্রের ঘাটতির খবর অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, যেকোনো সংঘাত মোকাবেলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় অস্ত্র রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উন্নত অস্ত্র তৈরি করছে।
যুদ্ধে যেসব মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনার শত শত ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
বাহরাইনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নৌঘাঁটিও ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। ঘাঁটিটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বিকল্প সরবরাহকেন্দ্র ব্যবহার করতে হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর রসদ পৌঁছাতে ১৪ থেকে ১৮ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে।
ধ্বংস হয়েছে মার্কিন ড্রোন ও বিমান
যুদ্ধে কয়েক ডজন মার্কিন বিমান ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি ড্রোনের দাম প্রায় ৩ কোটি মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া সাতটি কে-সি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবে মাটিতে থাকা পাঁচটি বিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় ১১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ইরাকে একটি কে-সি-১৩৫ বিমানের দুর্ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যু এবং আরব সাগরে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় একজন পাইলটের মৃত্যু রয়েছে।
যুদ্ধের খরচ ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুলাইয়ের শেষ দিকে কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ইতোমধ্যে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া ইরানের হামলায় ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। বিমান, স্থলপথ ও নৌপথে তাদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
জুনের শেষ নাগাদ এই উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার কাজে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের খরচ হয়েছে ১১ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
সবচেয়ে বেশি মার্কিন নাগরিককে ইসরায়েল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ছিল ইরাক ও জর্ডান। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হলেও তাদের পরিবহনে সবচেয়ে বেশি— ৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র বিক্রিও বেড়েছে
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে। এর মধ্যে সৌদি আরব সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
এসব বিক্রির মধ্যে সামরিক হেলিকপ্টার, গোলাবারুদ, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের সামরিক সহায়তা রয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, ইরানের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রের মজুত ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার খরচ ও ঝুঁকিও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ