‘মাদকের চেয়েও বিপজ্জনক’, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের বিরুদ্ধে বিজেপির অভিযান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিপশ্চিমবঙ্গেরক্ষমতায় আসার পর থেকে গরুর মাংসের সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রাজ্যের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মেনু থেকেও

2026-09-15T19:02:06+00:00
2026-09-15T19:02:06+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
‘মাদকের চেয়েও বিপজ্জনক’, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের বিরুদ্ধে বিজেপির অভিযান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০২ পিএম 
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ট্যাংরায় বন্ধ হয়ে থাকা কলকাতার একমাত্র কসাইখানা। ছবি : আল-জাজিরা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরুর মাংসের সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রাজ্যের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মেনু থেকেও ধীরে ধীরে গরুর মাংসের পদ বাদ যাচ্ছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা। শহরের ট্যাংরা এলাকায় রয়েছে কলকাতার একমাত্র গরু ও মহিষ জবাইয়ের কসাইখানা। সপ্তাহের এক কর্মদিবসে দুপুর ১২টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কসাইখানার সামনে পুরো এলাকা প্রায় ফাঁকা।

কলকাতা পৌর করপোরেশনের পরিচালনায় থাকা ঔপনিবেশিক আমলের ভবনটি বাইরে থেকে অনেকটা দুর্গের মতো দেখতে। বিশাল লোহার ফটক ভেতর থেকে বন্ধ। 

ফটকের মাঝের ছোট একটি ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, বিশাল খালি জায়গায় কয়েকজন স্কুলছাত্র দৌড়াদৌড়ি ও খেলাধুলা করছে।

কসাইখানাটির বিপরীতে থাকা একটি রাস্তার পাশের খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মেহমুদ আলম বলেন, মে মাসে কসাইখানাটি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ছেলেরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে খেলাধুলা করে।

তার দোকানে মূলত দিনমজুর, ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকেরা খেতে আসেন। আলম জানান, জায়গাটির এমন নির্জন চেহারায় অভ্যস্ত হতে তারও সময় লাগছে।

তিনি বলেন, আমার মনে হয় না, এই সরকার খুব শিগগির এটি আবার খুলতে দেবে। 


নির্বাচনের পরই কড়াকড়ি

১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে গবাদিপশু জবাই নিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে। এর মাত্র চার দিন আগে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। 

সরকারের ওই নির্দেশনায় পশ্চিমবঙ্গ অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ১৯৫০ কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং নির্দিষ্ট কিছু মহিষ জবাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাণীকে জবাইয়ের উপযুক্ত ঘোষণা করে সনদ নিতে হবে।

এই সনদ কেবল তখনই দেওয়া যাবে, যদি প্রাণীটির বয়স ১৪ বছরের বেশি হয়, কাজ বা প্রজননের জন্য অনুপযুক্ত হয়, অথবা বয়স, আঘাত, শারীরিক ত্রুটি কিংবা নিরাময়যোগ্য নয় এমন রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অনুমোদিত প্রাণী কেবল পৌরসভা বা স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত কসাইখানাতেই জবাই করা যাবে। প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


বিক্রি কমেছে, মাংসের পদও বাদ

মে মাসে ঈদের ঠিক আগে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরই কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের তীব্র সংকট দেখা দেয়।

ঈদ শেষ হওয়ার তিন মাসেরও বেশি সময় পরেও সংকট কাটেনি। অথচ পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই গরুর মাংস ব্যাপকভাবে খাওয়া হয়।

এর পেছনে শুধু জবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট প্রাণীর সনদ পাওয়ার বিষয়টিই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কলকাতায় গরুর মাংসের ব্যবসা করতে হলে ব্যবসায়ীদের আলাদা লাইসেন্সও প্রয়োজন।

কিন্তু কলকাতা পৌর করপোরেশন ভেঙে দেওয়ার পর এসব লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টিও আটকে আছে। জুন মাসে মেয়র ফিরহাদ হাকিম পদত্যাগ করার পর পৌর করপোরেশন ভেঙে দেওয়া হয়। কলকাতার পরবর্তী পৌর নির্বাচন ডিসেম্বর মাসে হওয়ার কথা রয়েছে।

মাহমুদ আলমের বন্ধু মোশতাকও গরুর মাংসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ব্যবসার লাইসেন্সের বার্ষিক নবায়নের সময় হয়েছে।

মোশতাক বলেন, তার পরিবারের আগে ছয় প্রজন্ম কলকাতায় গরুর মাংস সরবরাহের ব্যবসা করেছে। কিন্তু তাদের কাউকেই অতীতের কোনো সরকারের আমলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। 

তিনি বলেন, নির্বাচনের কারণে লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু কবে আবার নবায়ন হবে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু বলা হয়নি। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে আমি এক পয়সাও আয় করতে পারিনি। 

আলমের দোকানের সামনে বড় একটি কড়াইয়ে গরুর মাংসের ভুনা রান্না হচ্ছিল। তার পাশে আরেকটি ছোট কড়াইয়ে মাছের ঝোল।

আগের ভালো সময়ে দুই কড়াইতেই গরুর মাংস রান্না হতো। এখন তারা শুধু ভুনা বিক্রি করেন।

আলম বলেন, আগে তারা চাপ ও স্ট্যুও রান্না করতেন। কিন্তু এসব খাবারের জন্য ভালো মানের গরুর মাংস প্রয়োজন, যা গত কয়েক মাসে পাওয়া যাচ্ছে না। 

সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। আগে এক প্লেট ভুনার দাম ছিল ১০০ রুপি বা ১.০৪ ডলার। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১২০ রুপি বা ১.২৫ ডলার। 

কলকাতায় এক কেজি গরুর মাংসের দাম এখন ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপি বা ৩.৬৬ থেকে ৫.২২ ডলার। মে মাসের আগে একই পরিমাণ মাংসের দাম ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপি।

তবে দাম বাড়লেও বিক্রি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

আলম বলেন, এর কারণ শুধু মাংস কম পাওয়া নয়; আগের মতো মাংসের মান নিয়েও এখন নিশ্চিত হওয়া যায় না। এর পাশাপাশি বিজেপি সরকারের আমলে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতে দেখা যাবে—এমন ভয়ও অনেক ক্রেতার মধ্যে তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, তিনি কয়েকজন তরুণকে খুব মিস করেন, যারা নিয়মিত তার দোকানে গরুর মাংসের স্ট্যু খেতে আসতেন। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু।

আলম বলেন, আমরাও এখন প্রায় পুরোপুরি বাড়িতে গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আগে সপ্তাহে পাঁচ-ছয়বার খেতাম, এখন হয়তো সপ্তাহে একবার। এখন সবজি, সস্তা মাছ খাচ্ছি। হয়তো মুরগিও। খাসির মাংস কেনার সামর্থ্য নেই।

 

পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস খাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস

ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম বড় গরুর মাংস ভোক্তা রাজ্য।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের গ্রামীণ পরিবারের ১০.৪ শতাংশ এবং শহরের ৭.৯ শতাংশ পরিবার গরু বা মহিষের মাংস খাওয়ার কথা জানিয়েছে।

ভারতের অনেক হিন্দুর কাছে গরু পবিত্র হলেও, পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস খাওয়ার হার দেশটির অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বেশি। প্রতিবেশী আসাম এবং দক্ষিণ ভারতের কেরালার সঙ্গেও পশ্চিমবঙ্গের গরুর মাংস খাওয়ার হার তুলনীয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরুর মাংস খান। খ্রিস্টান, দলিত জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ এবং কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষও নিয়মিত খাদ্যের অংশ হিসেবে গরুর মাংস খান। 

কোনো প্রাণী জবাইয়ের আগে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের যে আইন রয়েছে, সেটি নতুন নয়। তবে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর এবারই এর প্রয়োগ অনেক বেশি কঠোর হয়েছে। 

সরকারিভাবে ট্যাংরার কসাইখানাটিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা কসাইখানার দেয়ালের পাশে থাকা ছোট সবুজ দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিয়ে বলেন, পরে আসুন, আজ প্রধান কর্মকর্তা নেই। 

এখন অফিসে কী কাজ হয়— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আসি, কয়েক ঘণ্টা থাকি, তারপর বাড়ি চলে যাই। 
কবে আবার স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম শুরু হবে, আদৌ হবে কি না— এ বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই বলেও জানান তিনি।
ব্যবসায়ীরা আগেই সংকটের আশঙ্কা করেছিলেন

কলকাতার ব্যবসায়ী আলফাজ লাইক বলেন, তিনি এই সংকটের সম্ভাবনা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন।

এপ্রিল মাসে, যখন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন চলছিল এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসার পথে ছিল, তখন তিনি মধ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় নিজের ডেইরি ব্যবসা বন্ধ করে দেন। 

তার খামারে অবসরপ্রাপ্ত গরুগুলো তিনি কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেন।

লাইক বলেন, কোনো গরু ১০০ রুপিতে কিনে থাকলে সেটি তিনি ৩০ রুপিতে বিক্রি করেছেন। স্বাভাবিক বাজারদরের তুলনায় এটি অনেক কম।

তার মতে, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু ব্যবসায়ীদের হয়রানির কারণে যে ঝামেলা তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে কম দামে গরু বিক্রি করাই ভালো ছিল। 

লাইকের আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যতালিকা থেকে গরুর মাংস পুরোপুরি হারিয়ে যেতে হয়তো আর বেশি সময় লাগবে না।

এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি সরকার গরুর মাংস খাওয়া ও গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ চালু বা কার্যকর করেছে। 

রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, ছত্তিশগড় ও কর্ণাটকে গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে।

রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা ও উত্তরাখণ্ডে গরুর মাংস বা এর তৈরি পণ্য বিক্রি সরাসরি নিষিদ্ধ।

মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে অবৈধভাবে জবাই করা গবাদিপশুর মাংস রাখা নিষিদ্ধ। মহারাষ্ট্রে গরু, ষাঁড় ও বলদ জবাই এবং তাদের মাংস রাখা নিষিদ্ধ। কর্ণাটকে মূলত গবাদিপশু জবাই এবং জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গবাদিপশু বিক্রি বা পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এসব আইনি বিধিনিষেধের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে কথিত ‘গরু রক্ষা’কারী দলগুলোর হামলা ও গণপিটুনির ঘটনাও ঘটেছে। এসব গোষ্ঠী গরু ব্যবসা বা গরুর মাংস বহনের অভিযোগে মুসলিম ও দলিতদের ওপর হামলা করেছে।

অনেক ক্ষেত্রে হামলার শিকার ব্যক্তি বা নিহতদের পরিবারের বিরুদ্ধেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা করেছে, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে নয়।

লাইক বলেন, আমি এমন একজন মানুষ, যে সকালের নাশতাতেও গরুর মাংস খেতাম। কিন্তু এখন পুরোপুরি গরুর মাংস বাড়িতে আনা বন্ধ করে দিয়েছি। 

তার ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস বহন করা এখন মাদক বহনের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে গেছে। 

বর্তমানে লাইক গরুর বদলে ছাগল কেনাবেচা করছেন। পাশাপাশি কৃষিকাজ করছেন এবং নিজের জমি ইজারা দিয়েও আয় করছেন।

রেস্তোরাঁর মেনু থেকে গরুর মাংস বাদ

মুসলিম অধ্যুষিত কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় বেশ কয়েকজন গরুর মাংস বিক্রেতা নিজেদের ব্যবসা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। শুধু নিয়মিত ক্রেতাদের সঙ্গেই তারা ব্যবসা নিয়ে কথা বলেন। 

এখানকার পাঁচটি গরুর মাংসের দোকানের মালিক ও ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, মে মাসের পর থেকে তাদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোকসান হয়েছে।

একজন দোকান ব্যবস্থাপক বলেন, এই সারির সব দোকানই প্রথম দুই মাস বন্ধ ছিল। গত দেড় মাসে আমরা আবার খুলতে পেরেছি।

আরেক দোকানদার বলেন, সরবরাহ নিয়মিত নয়, দাম বেড়েছে এবং ফলে বিক্রিও ভালো হচ্ছে না। পাশাপাশি মাংসের মানও আগের মতো নেই। 

গবাদিপশু জবাইয়ে নিয়মকানুন কঠোর হওয়া এবং মাংসের সরবরাহ ও মান কমে যাওয়ার কারণে গত তিন মাসে কলকাতার অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ তাদের মেনু থেকে গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ বাদ দিয়েছে। 

এর মধ্যে রয়েছে কলকাতার বিখ্যাত জাম জাম রেস্টুরেন্ট।

রেস্টুরেন্টটির পরিচালক শাদমান ফাইজে জানান, তারা খাবারের মানের সঙ্গে আপস করতে চাননি। তাই কলকাতায় তাদের তিনটি শাখার মেনু থেকেই গরুর মাংসের পদ বাদ দিতে হয়েছে। 

তিনি বলেন, এর ফলে তারা ক্রেতা হারিয়েছেন এবং এখনও প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে। এমনকি কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।

তিনি আশা করছেন, ক্রেতারা তাদের অন্য খাবারগুলোও আগের মতো পছন্দ করবেন। 

পার্ক স্ট্রিটের বাণিজ্যিক এলাকায় কাছেই রয়েছে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শহরের আরেক ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ওলিপাব। বহু বছর ধরে এই রেস্তোরাঁটি গরুর মাংসের স্টেকের জন্য পরিচিত। 

কিন্তু এখন সেখানে সবসময় স্টেক পাওয়া যায় না।

রেস্তোরাঁটির ব্যবস্থাপনার একজন সদস্য পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা মেনু থেকে এটি বাদ দিইনি। কিন্তু নিয়মিত গরুর মাংসের সরবরাহ না থাকায় যখন মাংস পাওয়া যায়, তখনই এটি পরিবেশন করা হয়।

তার মতে, কলকাতায় এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

কসাইখানা ও লাইসেন্স নিয়ে দায় ঠেলাঠেলি

আল জাজিরা কলকাতা পৌর করপোরেশনের কমিশনার ও প্রশাসনিক প্রধান স্মিতা পাণ্ডের কাছে জানতে চেয়েছিল, ট্যাংরার কসাইখানা কবে আবার চালু হবে এবং গরুর মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়ন কবে শুরু হবে।

তিনি বলেন, বিষয়টি অ্যানিম্যাল রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের (এআরডিডি) সঙ্গে সম্পর্কিত। 

তবে এআরডিডির অধীন প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক নিখিল কুমার শিট বলেন, কসাইখানা ও লাইসেন্সের দায়িত্ব কলকাতা পৌর করপোরেশনের।

তিনি বলেন, ট্যাংরার কসাইখানা বেশ কিছুদিন ধরে চালু নেই— এমন তথ্য আমার জানা নেই। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত কলকাতা পৌর করপোরেশন এবং সেখানে কর্মরত একজন ভেটেরিনারি কর্মকর্তা প্রাণীর উপযুক্ততার সনদ দেন। এর বাইরে কী ঘটছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।

কলকাতার বাইরেও সংকট

পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কলকাতার বাইরেও দেখা যাচ্ছে।

কলকাতার বাইরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বারুইপুর শহরের স্থানীয় বাজারেও গরুর মাংসের সংকট দেখা দিয়েছে।

মে মাসের পর থেকে সেখানে সকাল ১১টার মধ্যেই গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো দিন একেবারেই গরুর মাংস পাওয়া যায় না। 

বারুইপুরের বাসিন্দা সৈয়দ সাইফুল্লাহ কলকাতার একটি সেলুনে নাপিতের কাজ করেন। তিনি বলেন, মে মাসের আগ পর্যন্ত মাছ ও খাসির মাংসের দাম বাড়লেও গরুর মাংসের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। 

এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। গরুর মাংসের দামও অনেক বেড়েছে। 

তিনি বলেন, সারা জীবন আমাদের পরিবার প্রায় প্রতিদিন গরুর মাংস খেয়েছে। এখন সেটি সপ্তাহে এক বা দুইবারে নেমে এসেছে। 

এতটা কমিয়ে খাওয়ার পরও তাদের পরিবারের সাপ্তাহিক খাবারের খরচ ২০ শতাংশ বেড়েছে। মে মাসের আগে যেখানে সপ্তাহে ৫ হাজার রুপি খরচ হতো, এখন সেখানে ৭ হাজার রুপি লাগছে।

সাইফুল্লাহ বলেন, আমাদের আয় তো একইভাবে বাড়ছে না, তাই না? 

মালদায় গোপনে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা মালদায় জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মুসলিম।

সেখানকার একজন বাসিন্দা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এখন গরুর মাংস গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, আপনি যদি এমন কাউকে চেনেন যার কাছে গরু আছে, তাহলে তার কাছে গরুর মাংস চাইতে পারেন। 

তারপর রাতের অন্ধকারে গরু জবাই করে বাড়িতে বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তার মতে, মালদায় গরুর মাংস নিয়ে ব্যবসা বা লেনদেন করতে গিয়ে ধরা পড়ার ভয় এখন স্পষ্ট।

তবে তিনি বলেন, দরিদ্র মুসলমানদের জন্য এই মাংস ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। 

ফলে গরুর মাংস খাওয়া চালিয়ে যেতে অনেকে এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও জীবন পর্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। 


সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   ভারত  পশ্চিমবঙ্গ 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: