সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার জবাব ‘দায়িত্বশীল ও কঠোরভাবে’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর সৌদি আরব ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হুতিরা।
হুতিদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের লাহিজ, তাইজ, আল-জাওফ, মারিব ও হাজ্জাহ প্রদেশে সৌদি বাহিনী ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি আরব এখনো এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
সোমবার ও মঙ্গলবার সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে হুতি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ শহরে হুতিদের হামলায় ১৩ জন বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন। হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জোট এসব হামলার জবাব ‘দায়িত্বশীল ও দৃঢ়ভাবে’ দেবে।
এরপর হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সৌদি বিমানবাহিনীর এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে। তাইজ প্রদেশের খাদির জেলার একটি সরকারি কমপ্লেক্সেও হামলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমের দাবি, তাইজের ধুবাব ও মাকবানাহ এলাকায় সৌদি বিমান হামলায় তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুইজন শিশু। আহত হয়েছেন অন্তত দুজন। তবে এসব হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি ঘাঁটিতে হুতিদের হামলার দাবি
এর আগে, সোমবার হুতিরা জানিয়েছিল, তারা সৌদি আরবের খামিস মুশাইতে অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গার, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের মজুতকেন্দ্র লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়।
হুতিদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা এই হামলা চালিয়েছে। এর আগে গত পাঁচ দিনে সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনে প্রায় ৩০০টি বিমান হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করেছিল গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র
সাম্প্রতিক বিমান হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইয়েমেনে হুতিদের স্থল অভিযানও দ্রুত এগোচ্ছে। গত সপ্তাহে পশ্চিম ইয়েমেনের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায়, নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় অগ্রসর হয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী দাবি করেছে, তারা তাইজ প্রদেশে হুতিদের কাছ থেকে কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করেছে। ধুবাব ও লোহিত সাগরের উপকূলীয় আল-খোখা এলাকায় হুতি যোদ্ধা ও তাদের সামরিক সরঞ্জামেও হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হুতি ও ইয়েমেনি সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হুতিরা দক্ষিণ লোহিত সাগরের গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জও দখলে নিয়েছে। বাব আল-মান্দেবের মুখে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপেও তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে উদ্বেগ
ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাব আল-মান্দেবে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
ইয়েমেনের এক দশকেরও বেশি সময়ের যুদ্ধ গত জুলাইয়ে নতুন করে তীব্র হয়। হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলা শুরু করে। এতে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি ও বড় ধরনের সংঘাত বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ