প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে শত শত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক।
তিনি বলেন, ধ্বংস হওয়া বিভিন্ন স্থাপনা থেকে এমন মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে, যেগুলো দেখে মনে হচ্ছে পুরো পরিবারের সদস্যরা সেখানে নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে।
এক বিবৃতিতে টুর্ক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের ব্যাপারে অপেক্ষা করা পরিবারগুলোর কাছে এখন তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর আশঙ্কা সত্যি হয়ে ধরা পড়ছে, এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
তিনি জানান, এসব মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ২০২৪ সালের জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে উত্থাপিত উদ্বেগকে আবারও সামনে এনেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধের শুরুর দিকে আবাসিক ভবন ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইসরায়েল বরাবরই বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দেশটির দাবি, গাজায় হামাসের যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই অভিযান চালিয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে সাত বছর লাগতে পারে
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের প্রাণঘাতী হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই অভিযানে গাজায় প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমেছে। এসব ধ্বংসাবশেষ সরাতে প্রায় সাত বছর সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়ে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বন্ধ হয়। তবে নিয়মিত ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও হাজারো মানুষ
ফিলিস্তিনের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গাজার বিভিন্ন ধ্বংস হওয়া ভবনের নিচ থেকে ৬৩০টির বেশি মরদেহ ও মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ধারণা, এখনো ৮ হাজারের বেশি মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
ভলকার তুর্ক আশঙ্কা করছেন, এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা হয়তো প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় খুবই সামান্য। তার ভাষায়, এটি হয়তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র।
তিনি বলেন, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে ভবন ধ্বংস ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর অভিযানে গাজার বড় একটি অংশ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
তুর্ক আরও অভিযোগ করেন, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী যেখানে এখনো অবস্থান করছে, সেসব এলাকার কিছু অংশও ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। তবে তার দাবি, বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় সেখানে চাপা পড়ে থাকা মৃতদেহের প্রতি কোনো সম্মান দেখানো হচ্ছে না।
মরদেহ উদ্ধারে বাধার অভিযোগ
দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের প্রধান আজিথ সুনঘাই বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার কিট ও খননযন্ত্রের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করার কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে।
জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইসরায়েলের এসব পদক্ষেপের সম্মিলিত প্রভাবে গাজায় বড় পরিসরে মরদেহ খোঁজা, উদ্ধার ও শনাক্ত করার কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, অনেক সময় ফিলিস্তিনি উদ্ধারকারী দলকে খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মরদেহ খুঁজতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
গাজায় প্রবেশ ও পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলের সামরিক সংস্থা কোগাট অতীতে এমন কিছু পণ্যের ওপর দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, এগুলো সন্ত্রাসী সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ