মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এখন আছড়ে পড়েছে ইয়েমেনের মাটি ও সাগরে। ইরান-সমর্থিত হুতিবিদ্রোহী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার লড়াইয়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং প্রাণে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের অগ্রাভিযান ঠেকাতে ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তাইজ, মারিব এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বিভিন্ন প্রদেশে হুতিদের সামরিক অবস্থান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চিং প্যাড এবং অস্ত্র বহর লক্ষ্য করে জোরালো আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, হুতিরাও সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা, তায়েফ এবং মক্কার মতো জনবহুল শহরগুলোতে সম্ভাব্য বিপদের সাইরেন ও সতর্কতা জারি করেছে দেশটির সিভিল ডিফেন্স। এসব হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহত এবং আবাসিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। হুতিদের হামলায় সৌদিতে ১৩ জন আহত হয়েছে।
সংঘাতের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই সহিংসতায় ইয়েমেনের অভ্যন্তরে প্রায় ৯৪ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছেন।
পাশাপাশি সংঘাতের কারণে দেশটিতে চরম জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই তীব্র জ্বালানি ঘাটতি সাধারণ মানুষের দেশত্যাগের পথকেও শ্লথ ও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বহু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে জিবুতিসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে শুধু জিবুতিতেই দুই হাজারের বেশি ইয়েমেনি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন।
এই সংঘাত কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি লোহিত সাগর এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপরও অন্ধকার নেমে এসেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের আক্রমণ এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনীতির পারদ চড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও অর্থনৈতিক চাপ দিন দিন বাড়ছে।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও আঞ্চলিক আধিপত্যের এই দাবানলে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছে।
গত কয়েক দিনে হুতিরা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির পেরিম দ্বীপসহ (মায়ুন দ্বীপ) ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বৃহস্পতিবার আরেক ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় সৌদি আরবের তেল রফতানি আরও চাপের মুখে পড়ে।
পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার জন্য রিয়াদ ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে। সৌদি আরব ১৯৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন তৈরি করেছিল, যেন হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়েও তেল রফতানি অব্যাহত রাখা যায়। ওই যুদ্ধের সময়ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি তৈরি হয়েছিল।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি সৌদি আরবের এই পাইপলাইন দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৪ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। পাইপলাইনটি কখন সচল হতে পারে, সে বিষয়ে রিয়াদ কিছু বলেনি।
হুতিদের আক্রমণের জবাবে সৌদি ও ইয়েমেনি বিমানবাহিনী হুথিদের লক্ষ্যস্থলগুলোতে বোমাবর্ষণ করেছে। এই লক্ষ্যস্থলগুলোর মধ্যে লোহিত সাগরের বন্দরশহর মোখার আশপাশের অবস্থানগুলোও রয়েছে।
কিন্তু বিমান হামলা সত্ত্বেও হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কর্মকর্তারা। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন বলেছেন, হুতিদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তার জবাবে তারা সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।
ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন তা ফিরিয়ে দিয়ে শুধু গোয়েন্দা সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রোববার ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। অপরদিকে হুথিরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সোমবার জেদ্দায় যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্রাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট বাহিনী ২০১৫ সাল থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। তবে ২০২২ সালে দুপক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত ছিল। কিন্তু চলতি মাসে লড়াই আবার শুরু হয় এবং হুতিরা সৌদি আরবের অনুগত সরকারের বাহিনীগুলোকে ইয়েমেনের প্রায় পুরো পশ্চিম উপকূল থেকে হটিয়ে দেয়।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ