যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

চলতি বছর চীনের কূটনৈতিক তৎপরতায় দেশটির বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া,

2026-09-15T22:00:31+00:00
2026-09-15T22:00:31+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০০ পিএম 
সৌদি আরবের রিয়াদে বুলেভার্ড ওয়ার্ল্ডের চীনা প্যাভিলিয়নে দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখছেন। ছবি : আল-জাজিরা
চলতি বছর চীনের কূটনৈতিক তৎপরতায় দেশটির বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও জর্ডানের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এরই মধ্যে বেইজিং সফর করেছেন। 

সম্প্রতি কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির চীন সফর এবং চলতি বছরের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেইজিং সফর উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বাড়তে থাকা ভূমিকা আরও স্পষ্ট করেছে।

ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এখন এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে, চীন উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে চাইছে। বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্ত করছে বেইজিং। আর এই পদ্ধতি উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও মিল রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক শক্তি হতে চায় না চীন

উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনো যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাইরের সামরিক অংশীদার। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, অস্ত্র, নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং সামরিক ঘাঁটির কারণে এই অঞ্চলের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সামরিক শক্তির সঙ্গে তুলনা করে উপসাগরে চীনের প্রভাব বিচার করেছে। এই হিসাবে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানের কাছাকাছিও নেই। তবে কৌশলগত সাফল্য মাপার জন্য শুধু সামরিক শক্তিকে মানদণ্ড হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি ও সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে চীনের খুব বেশি আগ্রহ নেই। কারণ, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করেছে, চীনও দীর্ঘদিন ধরে তার সুবিধা পেয়েছে।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পরিবহনের সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে চীনা কোম্পানিগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোতে ব্যবসা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি কেনার সুযোগ পেয়েছে।

চীনের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা থেকে কম খরচে অনেক সুবিধা পাওয়া গেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার জায়গা দখল করে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নেওয়া চীনের জন্য খুব বেশি লাভজনক নয়।

এর পরিবর্তে চীন এমন খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে চীন যতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চায়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে চায় বেইজিং।

বন্দর থেকে প্রযুক্তি, সবখানেই চীনের বিনিয়োগ

বর্তমানে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে অংশীদারিত্ব তৈরি করেছে। এর মধ্যে বন্দর অন্যতম।

উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনালের যৌথ উদ্যোগে চীনের কসকো শিপিং পোর্টসের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারিত্ব রয়েছে।

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, উৎপাদন শিল্প, পণ্য পরিবহন, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ খাতেও চীনা কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে।

অর্থায়ন, চুক্তি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে সেখান থেকে চীনের সরে যাওয়া কঠিন হবে। একটি বিমানবাহী রণতরী অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে পারে, সামরিক সেনা কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বন্দর, কারখানা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় থাকা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সহজে সরিয়ে নেওয়া যায় না।

চীনের এই কৌশলের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজনৈতিকভাবে বেইজিংপন্থি হওয়া জরুরি নয়। শুধু চীনের প্রকাশ্য বিরোধিতা করাটা যেন এসব দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে খুব ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, এটাই চীনের জন্য যথেষ্ট।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক চায় উপসাগরীয় দেশগুলো

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা পরস্পরবিরোধী নয়।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উন্নত পশ্চিমা প্রযুক্তি চায়। অন্যদিকে তারা চীনের বড় বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং এশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগও নিতে চায়।

তাদের মূল লক্ষ্য হলো কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া। এ কারণে তারা অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা, ঝুঁকি কমানো এবং নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এই কৌশলের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং কাতারের আল-উদেইদসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর ফলে দেখা গেছে, একটি মাত্র নিরাপত্তা অংশীদার, একটি রপ্তানি বাজার, একটি নৌপথ, একটি প্রযুক্তিব্যবস্থা বা একটি অর্থের উৎসের ওপর বেশি নির্ভরতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এখন শুধু উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং ঝুঁকি কমানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।


তেলের বাইরে নতুন অর্থনীতি গড়ার চেষ্টা

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু নিরাপত্তা ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতিতেও বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।

তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উৎপাদনশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের হিউমেইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জি৪২ এআই খাতে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে।

তবে এআই শিল্প গড়ে তুলতে উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার, বিপুল বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।

তাই উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা তাদের এই নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা দিতে পারে।

সামরিক উপস্থিতিই এখন আর একমাত্র শক্তির মাপকাঠি নয়

এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনেরও কৌশলগত শক্তি পরিমাপের পদ্ধতি নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।

কোনো অঞ্চলে একটি দেশের কতগুলো সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, এখন হয়তো সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হতে পারে, আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে ওই দেশকে সরিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন।

উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি কোম্পানি ও কূটনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে গভীরভাবে যুক্ত।

অন্যদিকে চীন ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক তৈরি করছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাবেও রূপ নিতে পারে।

তাই ওয়াশিংটনের উচিত নয় প্রতিটি ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র অথবা চীনের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা।

তবে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিযোগাযোগ, সংবেদনশীল তথ্য এবং সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ রয়েছে। এসব খাতে স্পষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বিকল্প কী?

চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভালো পথ হতে পারে আরও শক্তিশালী বিকল্প তৈরি করা।

উপসাগরীয় দেশগুলোকে উন্নত প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং গভীর শিল্প সহযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে সব খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য ধরে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের লক্ষ্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে তার জায়গা নেওয়া নয়। বরং সামরিক অতিরিক্ত বিস্তার এড়িয়ে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন একটি প্রভাব তৈরি করা, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকবে।


সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  মধ্যপ্রাচ্য  চীন 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: