বাইরে থেকে সবই স্বাভাবিক। কোথাও অভিজাত আবাসিক ভবন, কোথাও সমুদ্রের পাশে বিলাসবহুল রিসোর্ট। কিন্তু দরজা খুলতেই বদলে গেল দৃশ্য। এক জায়গায় ৬৩ বিদেশি, অন্য জায়গায় হাজার হাজার আইফোন। সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে ল্যাপটপ ও মনিটর। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এমন দুটি আস্তানা ঘিরে এখন তদন্তে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
১৪ ফ্ল্যাটে ৬৩ বিদেশি
গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকায় একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ)। সেখান থেকে আটক করা হয় ৬৩ বিদেশি নাগরিককে। আটকদের মধ্যে লাওসের ৩৫, পাকিস্তানের ২১, চীনের ৫ এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। অভিযান চালিয়ে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ ও ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তিদের অনেকের কাছেই পাসপোর্ট ছিল না। পাকিস্তানি কয়েকজন ছাড়া অন্যরা বাংলা বা ইংরেজি বুঝতে পারেন না। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মহসীন নামে এক বাংলাদেশির সহায়তায় তারা জুনে প্রথমে ঢাকায় আসে। পরে চট্টগ্রামে আস্তানা গড়ে।
রিসোর্টে আইফোনের পাহাড়
চট্টগ্রামের ঘটনার কয়েক দিন আগে কক্সবাজারের রামুর হিমছড়িতে আরেকটি অভিযানে মিলেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে পাঁচ চীনা ও এক তাইওয়ানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেখান থেকে দুই দফায় উদ্ধার করা হয় প্রায় ২ হাজার ৬৮৭টি পুরোনো মডেলের আইফোন। এছাড়া পাওয়া যায় ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ এবং চীনা পুলিশের দুটি র্যাংক ব্যাজ ও পতাকা।
রিসোর্টের ভেতরে তৈরি করা হয়েছিল ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ। পুলিশ জানায়, বাবর আলী নামে এক ব্যক্তি নিজেকে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দিয়ে এপ্রিল থেকে রিসোর্টটি ভাড়া নেন। পরে তদন্তে ওই নামে কোনো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অভিযানের সময় পেছনের সৈকত দিয়ে আরও কয়েকজন বিদেশি পালিয়ে যায়।
কী করছিল তারা?
তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত মোবাইল, ল্যাপটপ ও সরঞ্জাম নিয়ে আসলে কী করছিল এই বিদেশিরা? পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বড় ধরনের অনলাইন প্রতারণার প্রস্তুতি চলছিল এসব জায়গায়। ফিশিং, ভুয়া অনলাইন শপিং সাইট, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নকল পরিচয় এবং রোমান্স স্ক্যামের মতো প্রতারণায় এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, চীন, লাওস ও কম্বোডিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের কারণে চক্রটি বাংলাদেশকে নতুন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছিল। তাদের সঙ্গে স্থানীয় সহযোগীরাও থাকতে পারে। চট্টগ্রাম পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সল আহমেদ জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি এই চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতে অভিযান চলছে।
রহস্যের কেন্দ্রে দুই বাংলাদেশি
চট্টগ্রামের ‘মহসীন’ আর কক্সবাজারের ‘বাবর আলী’—এই দুই বাংলাদেশির ভূমিকা এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়। তাদের সন্ধান পেলে বিদেশিদের বাংলাদেশে আনা এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
খুলশীর ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। উদ্ধার করা মোবাইল ও ল্যাপটপের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। ভাষাগত সমস্যার কারণে দোভাষীর সহায়তায় বিদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের ঘটনায় রামু থানায় প্রায় আড়াই থেকে তিনশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পরপর দুই অভিযানে বিদেশিদের এমন গোপন আস্তানা এবং বিপুলসংখ্যক ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনায় এখন সামনে আসছে আরও বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারক চক্রের নতুন ঘাঁটি হয়ে উঠছে?
সময়ের আলো/জেকিউএফ