মাত্র কয়েক মাস আগেও যেসব কোচিং সেন্টারে ভর্তি পরীক্ষার কোনো ব্যস্ততা ছিল না, সেখানে এখন আবারও ফিরেছে ছোট ছোট শিশুদের পদচারণে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল-বিকাল চলছে প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ক্লাস। শ্রেণিকক্ষে শিশুরা খাতা-কলম হাতে অঙ্ক, বাংলা ও ইংরেজি অনুশীলনে ব্যস্ত; বাইরে অপেক্ষায় উৎকণ্ঠিত অভিভাবকরা।
কারণ আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে লটারির পরিবর্তে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আনুষ্ঠানিক নীতিমালা এখনও না এলেও ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাবনাই আবার চাঙ্গা করে তুলেছে কোচিং বাণিজ্য। একই সঙ্গে বাড়ছে অভিভাবকদের উদ্বেগ এবং শিশুদের ওপর মানসিক চাপ।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লটারি পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা থাকলেও এর ফলে ভর্তি কোচিং প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল। এখন ভর্তি পরীক্ষা ফিরলে আবারও প্রতিযোগিতা, কোচিংনির্ভরতা ও বৈষম্যের পুরোনো চিত্র ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ভর্তি কোচিংয়ের বিরোধিতা করলেও প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন।
জানা গেছে, ঢাকার নামকরা মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুল, আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, সাউথ ব্রিজ স্কুল, সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের ভর্তির আশায় মূলত অভিভাবকরা কোচিং সেন্টারে ঝুঁকছেন। এর মধ্যে মিশনারি স্কুলগুলো ছাড়া বাকিগুলোতে লটারিতে ভর্তি হতো।
আরও জানা যায়, কোচিং সেন্টারে ভর্তিতে ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে। আর মাসিক বেতন ধরা হচ্ছে ২ থেকে ৬ হাজার টাকা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিফটে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন ক্লাস ও এক দিন পরীক্ষা নেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন অভিভাবক গ্রুপে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় কোন কোচিং ভালো, কোন বই পড়াতে হবে এবং ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সিলেবাস কী হতে পারে। ঢাকার সূত্রাপুরের ফার্মাসিস্ট রাজন হোসেন আগামী বছর তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিয়েছে। এলাকার নামকরা স্কুলগুলোতে মেয়েকে ভর্তি করাতে চান। মেয়ের ভর্তি নিয়ে তিনি তার টেনশনের কথা জানালেন। তিনি বলেন, লটারিতে ভর্তি হলে এত দুশ্চিন্তা ছিল না। এখন আবার বই, কোচিং, পরীক্ষা সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। মেয়েকে একটি কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছেন বলে জানান।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, মতিঝিল, রামপুরা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি কোচিংয়ের প্রচার চোখে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, ব্যানার, লিফলেট এবং নামকরা স্কুলগুলোর আশপাশে প্রচার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, রাজধানীতে শতাধিক কোচিং সেন্টার প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যাচ চালু করেছে। কোথাও চার মাসের কোর্স, কোথাও আবার সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন ক্লাস ও নিয়মিত মডেল টেস্ট নেওয়া হচ্ছে। ভর্তি ফি ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা এবং মাসিক বেতন ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্মীবাজারের একটি ভর্তি কোচিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি প্রস্তুতির ক্লাস চলছে। শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পড়াচ্ছেন শিক্ষক, আর বাইরে অপেক্ষা করছেন অভিভাবকরা। কোচিং পরিচালনাকারীরা বলছেন, লটারি চালুর পর কয়েক বছর ভর্তি কোচিং প্রায় বন্ধ ছিল। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের পর আবারও অভিভাবকদের আগ্রহ বেড়েছে।
ছয় বছর পর নীতির পরিবর্তন :
করোনা মহামারির সময় ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এর আগে দীর্ঘদিন ভর্তি পরীক্ষা ছিল। সেই সময় প্রশ্নফাঁস, তদবির, ভর্তি বাণিজ্য এবং কোচিংয়ের প্রসার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল।
সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আবার ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। সরকারের দাবি, এটি হবে ‘নামমাত্র’ পরীক্ষা এবং এমনভাবে আয়োজন করা হবে যাতে আলাদা কোচিংয়ের প্রয়োজন না পড়ে। তবে ভর্তি পরীক্ষার কাঠামো, প্রশ্নপদ্ধতি কিংবা মূল্যায়নের নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। শিক্ষাবিদদের মতে, ভর্তি পরীক্ষা ফিরলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে ছোট শিশুদের ওপর।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী শাম্মিন আজমেরীর মতে, চার-পাঁচ বছরের শিশুদের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষায় বসানো তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ইতিবাচক নয়। এতে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং ব্যর্থতার ভয় তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে শিশুদের অনানুষ্ঠানিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা তাদের জন্য উপযুক্ত নয়।
এখনও চূড়ান্ত হয়নি নীতিমালা :
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তি পরীক্ষার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে ঠিকই, তবে কীভাবে পরীক্ষা হবে, কেন্দ্রীয়ভাবে হবে কি না, মানবণ্টন কী হবে- এসব বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ জন্য একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, এটি হবে নামমাত্র পরীক্ষা। এমন একটি ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কোচিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন না হয়।
তবে বাস্তবতা বলছে, নীতিমালা প্রকাশের আগেই কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়া শুরু করেছে। ফলে সরকারের আশ্বাসের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা আগেভাগেই দেওয়ায় কোচিং সেন্টারগুলো ব্যবসা গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে নতুন করে আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন অভিভাবকরা।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ভর্তি পদ্ধতি বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত সংকট হলো মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি এলাকার বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন এবং ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা চালু করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান। কারণ ভালো স্কুলে ভর্তির প্রতিযোগিতা যতদিন থাকবে, ততদিন ভর্তি কোচিংও থাকবে। আর সেই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে কোমলমতি শিশুদেরই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি