মরক্কো থেকে কয়েক হাজার মানুষ স্পেনের সিউটায় প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। এদিকে ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা স্পেন সীমান্তে নজরদারি আরও কঠোর করবে।
মরক্কো থেকে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউটায় প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১৯ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় হাজার হাজার মানুষ এই অঞ্চলটিতে প্রবেশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ স্থল ও সমুদ্রপথে মরক্কো থেকে উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের এই ছিটমহল সিউটায় ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ সিউটায় প্রবেশ করে থাকতে পারে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সব ধরনের উপলব্ধ সম্পদ ব্যবহার করছে। তিনি শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাসকা-র সঙ্গে সিউটা সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
সিভিল গার্ড সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতা রাশিদ সিবিহি এই পরিস্থিতিকে "গুরুতর মানবিক সংকট" বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, হাজার হাজার অভিবাসী, যাদের মধ্যে অভিভাবকহীন শিশুরাও রয়েছে, ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছে এবং অনেকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সিউটার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, মানুষ এখনও প্রবেশ করছে। অতিরিক্ত যে বাহিনী এসেছে, তারা মূলত আহতদের সাহায্য ও অন্যান্য মানবিক কাজেই ব্যস্ত। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল।
নিহত ১৯ জনের মধ্যে অনেকেই ডুবে মারা গেছেন। এছাড়া তারাজাল সৈকতের ব্রেকওয়াটার সীমান্ত বেড়া পার হওয়ার সময় পদদলিত হয়েও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সিবিহি জানান।
সিউটার প্রবেশপথে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে জনতাকে ঠেকানোর চেষ্টা করে। সংঘর্ষের পর সেখানে একটি বাস ও সাতটি গাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবারের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রধানত মরক্কোর নাগরিকদের বিশাল জনতা ব্রেকওয়াটার পেরিয়ে স্থানীয় সড়কে প্রবেশ করছে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ পুরুষ হলেও নারী ও ছোট শিশুদের নিয়ে অনেক পরিবারও ছিল।
সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ
সিউটা এবং মেলিয়া উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর এবং এগুলোই ইউরোপীয় ইউনিয়নের আফ্রিকার সঙ্গে একমাত্র স্থল সীমান্ত। ইউরোপে প্রবেশের আশায় অভিবাসীরা প্রায়ই এই দুটি শহরে প্রবেশের চেষ্টা করে।
সিউটায় পৌঁছাতে অনেক অভিবাসী মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার সাঁতরে আসে। আবার কেউ কেউ কাছের বেলিউনেশ এলাকা থেকে অপেক্ষাকৃত কম দূরত্ব অতিক্রম করে প্রবেশের চেষ্টা করে।
সিউটার কর্তৃপক্ষের মতে, সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে এই রায় স্থলপথে সীমান্ত বেড়া টপকে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
তবে মরক্কোর কিছু অধিকারকর্মী এ ব্যাখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অধিকাংশ অভিবাসী এমন আদালতের রায় সম্পর্কে জানতেনই না।
এদিকে ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছে যে তারা স্পেন সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার করবে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ শুক্রবার সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই তিনি স্পেন সীমান্তে কঠোর তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত হস্তক্ষেপকারী সীমান্ত বাহিনী মোতায়েনেরও ঘোষণা দেন।
এই সংকটের প্রভাব ইতালিতেও পড়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তির উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা স্থগিত করতে পারেন, যদিও ইতালির সঙ্গে স্পেনের সরাসরি কোনো স্থলসীমান্ত নেই।
সিউটার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাস জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও পুলিশ ও সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে সীমান্তের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা অভিবাসন সংকটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় অতিরিক্ত জনবল ও সম্পদ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ