রাশিয়ায় তৈরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক (পার্সোনালাইজড) ক্যানসারের টিকা নিওঅনকোভ্যাক প্রথমবারের মতো একজন রোগীর শরীরে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। গবেষকের দাবি, টিকা নেওয়ার পর রোগীর শরীরে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া (ইমিউন রেসপন্স) তৈরি হয়েছে এবং রোগী বর্তমানে সুস্থ আছেন।
রাশিয়ার গামালেয়া এপিডেমিওলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক পরিচালক আলেকজান্ডার গিন্সবার্গ ৩০ জুলাই এ তথ্য জানান। গামালেয়া গবেষণা কেন্দ্র এই টিকা তৈরির অন্যতম অংশীদার।
গিন্সবার্গ জানান, স্টেজ-৩ মেটাস্ট্যাটিক মেলানোমায় আক্রান্ত ৬০ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগী চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মস্কোর হারজেন ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে নিওঅনকোভ্যাক-এর প্রথম ডোজ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন থাকলেও তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় রোগীর শরীরে খুবই ইতিবাচক রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এমন উপাদান তৈরি করছে, যা টিউমার এবং শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার কোষ (মেটাস্ট্যাটিক ফোকাস) শনাক্ত করে আক্রমণ করতে সহায়তা করবে।
রোগীকে আরও দুটি ডোজ দেওয়া হবে এবং পুরো চিকিৎসা চলাকালে তার রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে গামালেয়া গবেষণা কেন্দ্র আরও প্রায় ১০ জন মেলানোমা রোগীর জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা প্রস্তুত করছে, যা আগামী দেড় থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রস্তুত হওয়ার কথা।
গত বছর রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার চিকিৎসার অনুমোদন দেয়। এর একটি হলো নিওঅনকোভ্যাক, যা উন্নত পর্যায়ের মেলানোমার জন্য তৈরি এমআরএনএ-ভিত্তিক চিকিৎসামূলক টিকা। অন্যটি অনকোপেপ্ট, যা কোলোরেক্টাল ক্যানসারের জন্য তৈরি একটি পেপটাইড-ভিত্তিক ওষুধ।
রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার অব রেডিওলজি জানিয়েছে, নিওঅনকোভ্যাক কোনো প্রতিরোধমূলক টিকা নয়; এটি ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য তৈরি। রোগীর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা টিকা তৈরি করা হয়। এর লক্ষ্য হলো রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তা ক্যানসার কোষ নিজেই শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, কারণ এটি প্রতিটি রোগীর জিনগত তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসা নির্ধারণ করে।
রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, অনকোপেপ্ট গ্রহণকারী রোগীদের শরীরেও ইতিবাচক রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গামালেয়া গবেষণা কেন্দ্র বর্তমানে অগ্ন্যাশয়, কিডনি এবং নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যানসারের জন্য একই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফল প্রাথমিক পর্যায়ের এবং তা অল্পসংখ্যক রোগীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে পাওয়া। তাই এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে কিংবা বৃহৎ পরিসরে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল হবে, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ