সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কারাগারে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছেন বাংলাদেশের আলোচিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। অবশেষে তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে ইউএই সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখপাত্র মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে নথিপত্র প্রদান, দু দেশের আইনি পর্যালোচনা ও সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সাবেক এই আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিশ্লেষণ।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রেক্ষিতে গত ১২ই জুন দুবাইয়ের একটি শপিংমল থেকে তাকে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। গ্রেফতারের খবর পাওয়ার পরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম দফায় আরবি ও ইংরেজি ভাষায় প্রস্তুতকৃত ১৪৪ পৃষ্ঠার নথিপত্র পাঠানো হয়, যার মধ্যে মামলার বিবরণ, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরবর্তীতে দুবাই পুলিশ প্রাথমিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে ঢাকার সাথে পুনরায় যোগাযোগ করেছে এবং বন্দি প্রত্যর্পণের আইনি ও কারিগরি বিষয় সম্পর্কিত আরও বেশ কিছু অতিরিক্ত তথ্য-উপাত্ত তলব করেছে।
পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, মামলাগুলো যেহেতু দুদক তদন্ত করছে, তাই তাদের কর্মকর্তারাই এসব বাড়তি তথ্য-উপাত্ত প্রস্তুত করছেন। দুদকের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, নথিপত্র সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, এবং সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইন্টারপোল হয়ে ফাইলটি দ্রুত দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি ‘বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’ নেই (বাংলাদেশের শুধু ভারত ও থাইল্যান্ডের সাথে এ ধরনের চুক্তি রয়েছে)। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওলোরা আফরিন (যিনি বর্তমানে ইউএই-তে কর্মরত) জানান, চুক্তি না থাকলেও চারটি সুনির্দিষ্ট বিবেচ্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইউএই আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। প্রথমত, সংঘটিত অপরাধের সপক্ষে নিরেট প্রমাণ উপস্থাপন; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে যে অপরাধে মামলা হয়েছে (যেমন : জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন বা পাসপোর্ট জালিয়াতি), ইউএই-এর আইনি কাঠামোতেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি-না তা পর্যালোচনা; তৃতীয়ত, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি-না তা খতিয়ে দেখে বিচারকের সামনে উপস্থাপন; এবং চতুর্থত, দুই দেশের সরকারের মধ্যকার কূটনৈতিক তৎপরতা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, জাতিসংঘ সনদ অনুসারে উভয় দেশই এতে স্বাক্ষরকারী। এ সনদের ভিত্তিতে আগেও আসামি আনা হয়েছে এবং পাঠানো হয়েছে, ফলে প্রক্রিয়াটি খুব একটা জটিল হবে না।
তবে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আসামি ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে বেনজীর আহমেদের সম্ভাব্য বিদেশি নাগরিকত্ব। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা বিনিয়োগ সূত্রে তুরস্কের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে।
দ্য অ্যারাবিয়ান পোস্টের এক্সিকিউটিভ এডিটর সাইফুর রহমান জানান, বেনজীর আহমেদ যদি দুবাইয়ে বৈধ রেসিডেন্ট হন এবং সেখানে তার কোনো অপরাধ না থাকে, তবে তার আইনজীবীরা এই যুক্তি তুলে ধরে প্রত্যর্পণ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এর আগে পুলিশ পরিদর্শক মামুন হত্যা মামলার আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানের ভারতীয় পাসপোর্ট থাকার কারণে তাকে দুবাই থেকে ফেরানো যায়নি।
তবে আইনজীবী ওলোরা আফরিনের মতে, কেবল বিনিয়োগকারী হলেই আইনি শিথিলতা পাওয়া যাবে না; বরং সরকারের জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতাই এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশি ৫০টিরও বেশি অপরাধী ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় থাকলেও একাধিক আসামিকে সফলভাবে দেশে ফেরানোর নজির রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বাংলাদেশের 'সিকিউরিটি কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট' এবং 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ট্রান্সফার অব সেনটেন্সড পারসনস' নামে দুটি সমঝোতা রয়েছে। এই চুক্তির অধীনে নরসিংদীর হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়াকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এবং একই মামলার প্রধান আসামি আরিফ সরকারকেও ইউএই থেকে চলতি বছরের ৬ই মে ফেরত আনা হয়েছে।
এছাড়া চলতি বছরের ২৭শে মে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের আব্রাহাম খান হত্যা মামলার মূল আসামি মোবারক মণ্ডলকে কাতার থেকে ইন্টারপোলের সহায়তায় ফেরানো হয়। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফিরিয়ে আনার নজির আছে।
নথিপত্র হস্তান্তরের পর পুরো বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থানীয় আদালতে তোলা হবে, যেখানে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্কে অংশ নেবেন।
দুদক জানিয়েছে, প্রক্রিয়া কেবল শুরু হওয়ায় এখনই সুনির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার ইঙ্গিত অনুযায়ী, সমস্ত আইনি জটিলতা ও কূটনৈতিক চ্যানেল অতিক্রম করে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরবর্তীকালে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেনজীর আহমেদ। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পূর্বে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায় এবং দুদক তদন্ত শুরু করলে তিনি দেশ ছেড়ে দুবাই পালিয়ে যান।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি পাসপোর্ট জালিয়াতি সহ ৬টি মামলা করে দুদক। এর বাইরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে। আদালতের নির্দেশে ইতোমধ্যেই গোপালগঞ্জে তার মালিকানাধীন সাভানা রিসোর্ট ও স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে জেলা প্রশাসন।
সময়ের আলো/জেডি