বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ফিফা) বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক অধিকার আংশিকভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘিরে বিশ্ব ফুটবলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফের পর এবার প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। তবে উয়েফার মতো টুর্নামেন্ট বয়কটের ঘোষণা এখনও দেয়নি এএফসি।
গত মঙ্গলবার ফিফা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের নতুন বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
এর একটি অংশে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতে থাকলেও অর্থায়নে যুক্ত হবেন বাইরের বিনিয়োগকারীরা। তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের নামও আলোচনায় এসেছে।
এই পরিকল্পনা প্রকাশের পরই তীব্র আপত্তি জানায় উয়েফা। সংস্থাটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে তাদের ৫৫টি সদস্যদেশ ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন বলেন, বিশ্বকাপ কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের সম্পদ এবং সেটি বিক্রির জন্য নয়।
উয়েফার পর কনকাকাফ, কনমেবলও একই অবস্থান নেয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের ৪১টি সদস্য ফিফার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর শুক্রবার এক বিবৃতিতে এএফসিও উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। এএফসি বলেছে, বিশ্বকাপ বয়কটের আশঙ্কা এখন প্রকাশ্যে আলোচনায় আসা ফুটবলের জন্য উদ্বেগজনক।
সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত এফএফই নিয়ে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বিশ্বকাপের শক্তি আসে সব কনফেডারেশন ও বিশ্বের শীর্ষ ফুটবল দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে। এএফসি আরও অভিযোগ করেছে, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পরামর্শ ও সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে।
সংস্থাটির ভাষ্য, গণতন্ত্র শুধু ভোটাভুটিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়মতো আলোচনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সব পক্ষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই প্রকৃত গণতন্ত্র। এর আগে এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফাও সদস্য দেশগুলোর কাছে পাঠানো চিঠিতে এই প্রস্তাব উপস্থাপনের পদ্ধতিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
যদিও ফিফা জানিয়েছে, প্রস্তাবটি এখনও সদস্য দেশগুলোর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং প্রতিটি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে এএফসির দাবি, তাদের উত্থাপিত মূল উদ্যোগগুলোর সন্তোষজনক জবাব এখনও দেয়নি ফিফা। উয়েফার বয়কটের হুমকি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সূচিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে আগে ঝুঁকিতে পড়বে আগামী সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ, যেখানে ইউরোপের ছয়টি দলের অংশ নেওয়ার কথা। এরপর অক্টোবরে নারী বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের প্লে-অফ, নভেম্বরে কাতারে অনূর্ধ্ব-১৭ পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ভবিষ্যতে ২০২৭ নারী বিশ্বকাপ, ২০৩০ পুরুষ বিশ্বকাপ, ২০২৭ অনূর্ধ্ব-২০ পুরুষ বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ, ফুটসাল ও বিচ সকারের বিভিন্ন টুর্নামেন্টও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার সদস্য দেশগুলোকে এই প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। পরিকল্পনাটি অনুমোদন পেলে আগামী বছরের শুরু থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এরই মধ্যে ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার পর এশিয়ারও বিরোধিতায় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি কনফেডারেশন কার্যত ফিফার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। ফলে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ এবং তার নেতৃত্ব; দুটিই এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
অন্যদিকে সব সমালোচনার জবাবে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফিফা জানিয়েছে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’। বিবৃতিতে ফিফা আরও বলেছে, ‘জনসম্মুখে প্রকাশিত মতামত ও উদ্বেগকে আমরা সম্মান করি এবং উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরামর্শ প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি।’
এ ছাড়া সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘আমরা এই পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাব, যাতে প্রতিটি সদস্য সংস্থা প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ভোট দিতে পারে।’ বিতর্কের জবাবে ফিফা স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না। এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যা ফিফা কখনো বিবেচনা করবে।’
আর এদিকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ‘বিশ্বকাপের স্বত্ব’ বিক্রির পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন তার সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কলডেরো। শুক্রবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের এই ফুটবল কর্মকর্তার। তার মতে, এমন কিছু হলে সেটা হবে ‘ফুটবলের জন্য বাজে চুক্তি।’
ফিফার ভবিষ্যৎ কাঠামো গঠনে সাহায্যের জন্য ২০২১ সালে ইনফান্তিনোর দ্বারা নিয়োগ পাওয়া কলডেরো বলেছেন, ‘সবকিছু ঠিকমতো যাচাই ছাড়াই ফুটবলের ভবিষ্যতকে বন্ধক রাখা হচ্ছে। ‘ফিফার সদস্য সংস্থাগুলোর জন্য এটা হবে বাজে এক চুক্তি, ফুটবলের জন্যও হবে বাজে চুক্তি এবং খেলাটির লম্বা সময়ের ভবিষ্যতের জন্যও বিষয়টা একইরকম হবে।’
অন্যদিকে ফিফার সঙ্গে এই টানাপোড়েনে বাংলাদেশ কোন দিকে এগোবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও ফিফার কাছ থেকে এমন বার্তা পেয়েছে। নির্বাহী কমিটিতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে বাফুফে। এত তীব্র বিরোধিতার মধ্যেও টুর্নামেন্ট আরও বড় করার পথে এগোচ্ছে ফিফা।
সংস্থাটি ২০৩০ সাল থেকেই বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করার সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্য টাইমসের প্রকাশিত একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ফিফা ৩০ জুলাই ফিফা একটি ব্রিফ করেছে।
যেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ৬৪ দলে উন্নীত হলে আয়, সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, ফেডারেশন, কনফেডারেশন, লিগ, ক্লাব ও সামগ্রিক ফুটবল ব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করবে একটি স্বাধীন সংস্থা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও