২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর। কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে একটি মাদরাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধসে পড়ে ভবনটির দেয়াল ও ছাদের একাংশ। পরে ওই বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর দেশের বিভিন্নস্থানে নিয়মিত বিরতিতে ঘটতে থাকে একের পর এক বিস্ফোরণ। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন আলামত।
গত কয়েক দিনের ব্যবধানে মতিঝিলে ‘ছাতা বোমা’, সাভারে ‘প্রেশার কুকার বোমা’ উদ্ধারের পর গতকাল রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থান থেকে বোমাসদৃশ দুটি পরিত্যক্ত বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে শরীয়তপুরের জাজিরা, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লাতেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে জঙ্গিবাদ নিয়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি আতঙ্ক নেই। জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত সংঘটিত বোমা বিস্ফোরণ এবং বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে যোগসূত্রের সন্ধান করছেন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীরা। এসব ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামত এবং গ্রেফতারদের পারস্পরিক সম্পর্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা যায়।
কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের ঘটনায় মূল আসামি মাদরাসাটির পরিচালক শেখ আল আমিন। এ ঘটনায় ওই শেখ আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। উম্মুল কুরান মাদরাসার পরিচালক শেখ আল আমিনের বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রপন্থায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অতীতে জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৫টি মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
‘প্রেশারকুকার বোমা’
গত ৩১ জুলাই ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি চায়ের দোকানের সামনে ফেলে যাওয়া একটি ব্যাগ থেকে প্রেশারকুকারের ভেতর বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট সেটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে।
জাজিরায় বিস্ফোরণ
গত ২৯ জুলাই শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় বিস্ফোরণে একটি বাড়ির টয়লেটের ছাদ ও পানির ট্যাঙ্ক ভেঙে পড়ে। এ সময় বিস্ফোরণের বিকট শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর এক দিন আগে একই উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়নের এক প্রবাসীর বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাঙ্কে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে ককটেলের আলামত উদ্ধার করেছে জাজিরা থানার পুলিশ।
‘ছাতা বোমা’
গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি ছাতার ভেতর থেকে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ফিরতি রথযাত্রাকে টার্গেট করে এই বোমা ফেলে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ
কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের পর গত মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অন্তত পাঁচটি ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ।
ডিএমপির সিটিটিসি সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরিত বোমা ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, অ্যাসিটোন ও নাইট্রিক অ্যাসিডের তৈরি। আর মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার করা বোমাটি জিআই পাইপের মধ্যে তৈরি। সেটাতে সার্কিট ও ব্যাটারি যুক্ত ছিল। কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণসহ আগের তিনটি ঘটনার সঙ্গে সর্বশেষ বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর যোগসূত্র আছে কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
মতিঝিলে ‘ছাতা বোমা’, আশুলিয়ায় ‘প্রেশারকুকার বোমা’, গত ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে পুলিশের ওপর হামলার পর দুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে উদ্ধারকৃত বোমা, গত মার্চে রাজধানীর সায়েদাবাদের জনপদ মোড়ে পুলিশের তল্লাশির সময় বিস্ফোরণের ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামত, একই মাসের ৭ তারিখে কুমিল্লা শহরের একটি শিবমন্দিরে দুর্বৃত্তদের রেখে যাওয়া ককটেল বিস্ফোরণে পুরোহিতসহ অন্তত ৪ জন আহত হওয়ার ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামতের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জানা যায়, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লায় বিস্ফোরণের ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে কেরানীগঞ্জের ঘটনায় যুক্ত শেখ আল আমিনের ঘনিষ্ঠ দুজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। তারা হলেন- নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনটি ঘটনাতেই এই দুজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নজরদারির অভাবে মাথা চাড়া
৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর অনলাইন কার্যক্রম, সন্দেহভাজন সদস্যদের চলাচল, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের তৎপরতা এবং বিদেশি উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। সেই সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর সদস্যরা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৫ আগস্টের পর জঙ্গিবাদ মামলায় অভিযুক্ত অনেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অনেকে জেল থেকে পালিয়ে গেছেন। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ নেই। এদের অনেকের সঙ্গে বিদেশি সংগঠনের যোগাযোগ থাকতে পারে।
কেরানীগঞ্জে বোম বিস্ফারণসহ সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করতে হবে। সাম্প্রতিক দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বোমাটির যে বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন এতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে উগ্রবাদের সঙ্গে যারা জড়িত তারা ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটা ব্রিদিং টাইম পেল। যে সময়ে তারা নিজেদের সংগঠিত করছে, তারা টার্গেট ফিক্স করছে, হয়তো ভবিষ্যতে আমরা এর কিছু প্রয়োগ দেখব।
তিনি বলেন, হলি আর্টিজান থেকে শুরু করে অনেক ঘটনা দেখেছি। এগুলো শুধু যে দেশের ভেতরে এদের যোগাযোগ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আইএসআই বা আল কায়েদার যে ভগ্নাংশ এখনও এক্সিস্ট করছে, এদের কারও না কারও সঙ্গে এদের সংশ্লিষ্টতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মিরপুর ও ফার্মগেটে পরিত্যক্ত বস্তু
রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে গতকাল শনিবার সকালে বোমাসদৃশ দুটি পরিত্যক্ত বস্তু উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, দুটি বস্তুতেই কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক উপাদান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় নগরবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
ডিএমপি জানায়, খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি সন্দেহজনক ব্যাগটি এক্সরে পরীক্ষায় ভেতরে কৌটাসদৃশ একটি বস্তুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পরে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণ করে ফ্র্যাঞ্জিবল ডিসরাপ্টর ব্যবহার করে ব্যাগটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়। এরপর পরীক্ষা করে দেখা যায়, ব্যাগের ভেতরে ছিল জর্দার একটি কৌটা ও পান।
অন্যদিকে ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত বস্তাকে ঘিরেও বোমা সন্দেহের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হ্যান্ড এন্ট্রির মাধ্যমে বস্তাটি পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, বস্তার ভেতরে কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক বস্তু নেই।
ডিএমপি জানিয়েছে, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বদা সতর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে গুজব বা যাচাইবিহীন তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি আতঙ্ক নেই
দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি আতঙ্ক নেই এবং কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন।
শনিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব তথ্য জানান।
মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে। যারা নাশকতার পরিকল্পনা করছে কিংবা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে