নজিরবিহীন অভিবাসী সংকটে স্পেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো সীমান্তঘেঁষা স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী সংকট তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায়

2026-08-02T02:54:48+00:00
2026-08-02T02:54:48+00:00
 
  রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নজিরবিহীন অভিবাসী সংকটে স্পেন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ২:৫৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো সীমান্তঘেঁষা স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী সংকট তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী স্থল ও সমুদ্রপথে শহরটিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। 

এ সময় সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। স্পেনের অংশে ৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরক্কোর দিকেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। স্পেন সরকার জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ৩০০ জনকে মরক্কোতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা তারা স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন।

এরমধ্যে অনেকে সেউতায় প্রবেশে ব্যর্থ হওয়ার পর অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অপর ছিটমহল মেলিলাতে প্রবেশের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছেন। শনিবার মরক্কো-মেলিলা সীমান্তের বেনি আনসার ক্রসিং এলাকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘাত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে এই সংঘাতের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। 

মরক্কোভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হিবাপ্রেস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শত শত অভিবাসনপ্রত্যাশী বেনি আনসার সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জ এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

পুলিশের ওপর হামলা ও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে সীমান্ত থেকে কমপক্ষে ৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে হয়েছে বলে জানিয়েছে হিবা প্রেস।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনে মরক্কো ও সেউতার মধ্যকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়ে। এর সুযোগে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাজারো মানুষ বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সীমান্ত অতিক্রম করে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন। প্রবেশের চেষ্টা করা মানুষের সংখ্যা সেউতার মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। ফলে ছোট্ট এই শহরে দ্রুত মানবিক সংকট দেখা দেয়।

উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত স্পেনের আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিলা, যা সেউতা থেকে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে। সেউতা ও মেলিলা-এই দুটি শহরই আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত। উন্নত জীবনের আশায় কিংবা সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ইউরোপে যেতে চাওয়া অভিবাসীদের কাছে তাই অঞ্চল দুটি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রবেশদ্বার।

১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেউতায় খিস্টান ও মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। স্থানীয় স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দাদের পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন কর্মস্থলে আসা হাজারো শ্রমিকও সেখানে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রয়েছে।

তবে চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মরক্কো এখনও সেউতা ও মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটি অঞ্চল দুটিকে নিজেদের ‘অধিকৃত ভূখণ্ড’ বলে দাবি করে।

কেন অভিবাসীদের জন্য ‘হটস্পট’?
আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জীবনের আশায় কিংবা যুদ্ধ-সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ইউরোপে যেতে চাওয়া মানুষের অন্যতম প্রবেশপথ স্পেন। সেই পথের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দরজা সেউতা ও মেলিলা।

অনেক অভিবাসী মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সাঁতরে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কেউ আবার কাছের বেলিউনেশ এলাকা থেকে সীমান্ত অতিক্রম করেন। সীমান্তজুড়ে উঁচু বেড়া, কাঁটাতার ও কঠোর নিরাপত্তা থাকলেও সুযোগ পেলেই অনেকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর পর অনেককে তাৎক্ষণিক মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়। তবে কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে স্পেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ পান।

এই সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও নতুন নয়। ২০২২ সালে মেলিলায় প্রবেশের সময় অন্তত ২৩ জন নিহত হন। এর আগে ২০১৪ সালে সেউতার সীমান্তে বেড়া টপকাতে বা সমুদ্রপথে প্রবেশের চেষ্টায় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩৫ হাজারের বেশি অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এ সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

কীভাবে একসঙ্গে ৫০ হাজার মানুষ ঢুকে পড়ল?
এত বড়সংখ্যক মানুষের একযোগে সীমান্ত পার হওয়ার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। মরক্কো সরকার এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এর পেছনে কেবল মানব পাচারকারী চক্র নয়, রাজনৈতিক বার্তাও কাজ করেছে। সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আলজেরিয়া সফর করেন। এর পরপরই সেউতা সীমান্তে এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়।

উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো ও আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে রয়েছে ওয়েস্টার্ন সাহারা। অঞ্চলটির স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন করে আলজেরিয়া, আর পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে মরক্কো। ২০২১ সালেও স্পেন ও মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সময় সেউতায় হাজারো মানুষ প্রবেশ করেছিলেন। তখন মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবার দাবি করেছেন, মানব পাচারকারী চক্র গুজব ছড়িয়েছিল যে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের কারণে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অনিয়মিত অভিবাসীদের আর তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানো যাবে না। সেই গুজবে উৎসাহিত হয়ে বহু মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেছেন।

তবে ইতালির ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের অভিবাসন গবেষক মাত্তেও ভিলার মতে, এক রাতে ৫০ হাজার মানুষের সীমান্ত পার হওয়া কেবল গুজবের ফল হতে পারে না। তার মতে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে মরক্কোর শিথিলতাই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যা ইউরোপের ওপর নিজেদের প্রভাব প্রদর্শনের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাটিকে স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।

ঘটনাটি ইউরোপীয় রাজনীতিতেও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন ডানপন্থি রাজনৈতিক দল স্পেনের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছে। ইতালির কট্টর ডানপন্থি সরকার স্পেনকে শেনজেন অঞ্চল থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবি তুলেছে, যদিও সেউতা ও মেলিলা প্রচলিত শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। একই সময়ে ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। 

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   অভিবাসী  সংকট  স্পেন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: