ছাত্র-জনতার প্রবল প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে অর্জিত পাঁচ আগস্ট, যা দেশের সিংহভাগ মানুষের জন্য একটি বিশেষ অর্জন। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে দিনটি। তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী আর সমর্থকদের জন্য দিনটি পরাজয় আর গ্লানির। অন্যদিকে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী।
দুই বছর আগেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী ‘শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো দিনটিকে। এ ছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছিল। দিনটিকেও তারা কালো দিবস হিসেবে পালন করে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জন্য দিন তিনটি বিশেষ তাৎপর্যময়। একদিকে পরাজয় আরেকদিকে শোক। একই মাসে বিশেষ এই দিন তিনটি ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির দেশ-বিদেশে পলাতক নেতাকর্মীরা নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে, এমন আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাই এই মাসটি ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।
পুলিশ সদস্যদের নিজেদের জান-মাল রক্ষায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। রাজধানী প্রবেশমুখ, মেস ও হোটেলগুলোর ওপর নজদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৃদ্ধি করা হয়েছে সাইবারকেন্দ্রিক নজরদারিও। রাজধানীতে ফুট ও মোটরসাইকেল প্যাট্রোলিংয়েল সঙ্গে তল্লাশি অভিযানও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যাতে সক্রিয় হতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের সবকটি ইউনিট এসব নিয়ে দিন-রাত কাজ করছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের ধরতেও পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারে পর এসব অভিযান আরও বেশি জোরদার করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশেষ বৈঠক করেছে পুলিশ কর্মকর্তারা। আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পাঁচ আগস্ট ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, আগস্ট মাসে ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম করতে পারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। করতে পারে চোরাগোপ্তা হামলা। এসব কার্যক্রমের জন্য দেশ-বিদেশে পলাতক নেতারা অর্থ সরবরাহ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় আছে দলটির নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে উসকানিমূলক বিভিন্ন পোস্ট করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমেও গোপন যোগাযোগ করছে দলটির পলাতক নেতাকর্মীরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো পুলিশের একাধিক সাইবার ইউনিট নজরদারি করছে বলে জানা যায়। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
গত ১ আগস্ট রাজধানীর মিরপুরে ঝটিকা মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিছিলে ধাওয়া দিয়ে ১৭ জনকে আটক করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এর আগে ১৫ জুলাই গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২০ জনকে আটক করে পুলিশ।
এসব কিছু মাথায় রেখে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৩১ জুলাই পল্লবী থেকে আটক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে পুলিশ জানতে পারে, বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে প্রতিনিয়ত তাদের যোগাযোগ হয়।
এর আগে গত মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শরীয়তপুরের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার সাঁটিয়ে দেয় দলটির নেতাকর্মীরা। সদর ও নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারী কর্মীদের পোস্টার টানাতে দেখা গেছে।
এসব ঘটনার মধ্যেই খবর বেরিয়েছে আগামীকাল পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে আসবে। পাঁচ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি সাউথ এশিয়া) নয়াদিল্লিতে এ বিষয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। সেখানে নিজের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশে তার ফেরার বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন বলে জানিয়েছে ভারতের অনলাইন ইন্ডিয়া টুডে। এতে বলা হয়, ওই অনুষ্ঠান পাঁচ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আয়োজন করা হয়েছে নয়াদিল্লির মথুরা রোডে অবস্থিত স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে। এই ইভেন্ট ওই ক্লাবের সামাজিকমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদিকে সোমবার জানিয়েছেন, পলাতক শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ব্যক্তি যাতে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
এদিকে অল্প সময়ের ব্যবধানের দেশের বেশ কিছু স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ সদর দফতর থেকে এরপর সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশ সদস্যদের। রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে গত শনিবার সকালে বোমাসদৃশ দুটি পরিত্যক্ত বস্তু উদ্ধার কেন্দ্র করে সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, দুটি বস্তুতেই কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক উপাদান পাওয়া যায়নি।
গত ৩১ জুলাই ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি চায়ের দোকানের সামনে ফেলে যাওয়া একটি ব্যাগ থেকে প্রেশার কুকারের ভেতর বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। গত ২৯ জুলাই শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় বিস্ফোরণে একটি বাড়ির টয়লেটের ছাদ ও পানির ট্যাঙ্কি ভেঙে পড়ে। এর এক দিন আগে একই উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়নের এক প্রবাসীর বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাঙ্কে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি ছাতার ভেতর থেকে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করা হয়।
এরকম অবস্থার প্রেক্ষাপটে গত শনিবার পুলিশ সদর দফতরের অপারেশন্স কন্ট্রোল রুম থেকে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটে একটি জরুরি বার্তা পাঠিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। বার্তায় বলা হয়, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুর্বৃত্তরা পুলিশের ব্যবহৃত জিপ, পিকআপ, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
এ কারণে দায়িত্ব পালনকালে কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামাতে হলে নিরাপদ স্থানে পার্ক করতে হবে এবং তা পুলিশের নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্ব শেষে থানা, পুলিশ লাইন্স ও অফিস প্রাঙ্গণে রাখা যানবাহনের নিরাপত্তা জোরদার করতে নিয়মিত টহল, নজরদারি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু শনাক্তে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশ সদস্যদের সক্রিয় ও সতর্ক রাখতে নিয়মিত এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ঘিরে আজ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সময় এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পাঁচ আগস্ট কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে নাশকতা করতে দেওয়া হবে না। সেই শক্তিও এই দলটির এখন আর নেই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি