৪ আগস্ট সাতকানিয়া, আন্দোলনকারীদের পানি খাইয়েছিল নারী-শিশুরা

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। সারাদেশের ন্যায় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া। দুপুর

2026-08-04T17:35:35+00:00
2026-08-04T17:36:01+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
৪ আগস্ট সাতকানিয়া, আন্দোলনকারীদের পানি খাইয়েছিল নারী-শিশুরা
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৫ পিএম  আপডেট: ০৪.০৮.২০২৬ ৫:৩৬ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে আন্দোলনকারীদেরকে পানি খাওয়াচ্ছেন নারীরা। ছবি : সংগৃহীত
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। সারাদেশের ন্যায় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া। দুপুর শুরু হতেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন জড়ো হতে থাকেন মিঠাদিঘী এলাকায়। দুপুর ৩টার পর মিঠাদিঘী থেকে শুরু হয় বড় একটি বিক্ষোভ মিছিল। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। মিছিলটি যত কেরানীহাটের দিকে এগোচ্ছিল, ততই বাড়ছিল জনসমাগম।

একদিকে ছিল আন্দোলনকারীদের স্লোগান, অন্যদিকে কেরানীহাটে অস্ত্র হাতে অবস্থান নেওয়া একদল যুবক। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও মানবিকতার এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। নারী-শিশুসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ বোতল ও পাত্রে করে পানি নিয়ে এগিয়ে আসেন আন্দোলনকারীদের কাছে। কেউ হাতে পানি তুলে দেন, কেউ রাস্তার পাশে বসিয়ে পানি পান করান।

দীর্ঘ পথ হেঁটে আসা ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের অনেকেই তখন স্থানীয়দের দেওয়া পানি পান করে আবার মিছিলে যোগ দেন। গুলির আতঙ্কের মধ্যেও নারী ও শিশুদের এমনভাবে পানি খাওয়ানোর দৃশ্য সেদিনের আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য মানবিক মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট দুপুরে মিঠাদিঘী এলাকায় আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কয়েক হাজার মানুষ সড়কে নেমে আসেন। মিছিলটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে কেরানীহাটের দিকে এগিয়ে যায়।


মিছিলের সামনে ও পেছনে ছিল বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তরুণদের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুরাও আশপাশে অবস্থান নেন। স্থানীয় অনেক বাসিন্দা দোকান ও বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখেন। কেউ আন্দোলনকারীদের পানি দেন, কেউ খাবার দেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও সাধারণ মানুষের একটি অংশ আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিল কেরানীহাটের কাছাকাছি পৌঁছালে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কেরানীহাটে অবস্থান নেওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের উত্তেজনা তৈরি হয়।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কেরানীহাট হক টাওয়ার ও আশপাশের এলাকায় কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের মিছিল এগিয়ে আসার সময় তাদের একটি অংশ গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দে লোকজন ছুটোছুটি শুরু করেন। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দোকান ও ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন।

ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন সাংবাদিকও তখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েন বলে জানান। তাদের ভাষ্য, ভবনের ওপর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সময় অস্ত্রধারীদের কয়েকজনের গতিবিধি দেখা যায়। সাংবাদিকরা ছবি বা ভিডিও ধারণ করছেন কি না, তা নিয়েও তাদের দিকে নজর রাখা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুলির পরও মিছিল পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়নি। বরং বিপুলসংখ্যক মানুষ একত্রিত হয়ে এগিয়ে গেলে অস্ত্রধারীরা সেখান থেকে সরে যায়। পরে ঘটনাস্থলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। এ সময় সেখানে পড়ে থাকা তাদের কয়েকটি মোটরসাইকেলে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়।

সেদিনের ঘটনাকে ঘিরে এখনো স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে একটি মানবিক দৃশ্য। গুলির শব্দে যখন মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন, তখন স্থানীয় কয়েকজন নারী ও শিশুকে আন্দোলনকারীদের পানি দিতে দেখা যায়।

কেউ ছোট বোতল হাতে নিয়ে এগিয়ে যান, কেউ আবার বড় পাত্রে করে পানি নিয়ে আসেন। তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের কেউ দাঁড়িয়ে পানি পান করেন, আবার কেউ রাস্তার পাশে বসে পানি পান করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকার কারণে অনেক আন্দোলনকারী তখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। স্থানীয়দের এই সহযোগিতা তাদের কিছুটা স্বস্তি দেয়।

সেদিনের এমন দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে আন্দোলনের সংঘাতপূর্ণ চিত্রের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতার বিষয়টিও সামনে আসে।

তবে ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিন প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্নের শেষ নেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ছবি ও ভিডিওতে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে এলেও তাদের সবাইকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—সেদিন কারা অস্ত্র নিয়ে কেরানীহাটে অবস্থান নিয়েছিল, কার নির্দেশে তারা সেখানে এসেছিল এবং কারা গুলি ছুড়েছিল?

আরও প্রশ্ন রয়েছে, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের পরও এসব অস্ত্র কোথায় গেল। ঘটনার পর অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের শনাক্তে কী ধরনের তদন্ত হয়েছে, তারও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান স্থানীয়রা।

৪ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে থানায় মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটে। মামলায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, মামলার এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি ভিডিও ও ছবিতে অস্ত্র হাতে যাদের দেখা গেছে, তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ—ঘটনার মূল অস্ত্রধারীদের অনেকে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সাতকানিয়ার কেরানীহাটে যা ঘটেছিল, তা এখনো স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে তাজা। একদিকে ছিল অস্ত্র ও গুলির ভয়, অন্যদিকে ছিল হাজারো মানুষের প্রতিরোধ। আর সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষের পানি নিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্যটি হয়ে আছে দিনটির মানবিক প্রতিচ্ছবি।

তবে দুই বছর পরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—সেদিন গুলি চালানো অস্ত্রধারীরা কারা? তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল কারা? গুলির নির্দেশদাতা কে? ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো কোথায়? এবং এত সময় পেরিয়ে গেলেও তারা কেন পুরোপুরি আইনের আওতায় আসেনি?

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ৪ আগস্টের কেরানীহাটের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে গুলিবর্ষণে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করা হবে। একই সঙ্গে অস্ত্রের উৎস ও ব্যবহারের বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   সাতকানিয়া  আন্দোলনকারী  পানি  নারী  শিশু  সময়ের আলো  ৪ আগস্ট  জুলাই আন্দোলন  চট্টগ্রাম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: