২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর পুরান ঢাকায় অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। কিন্তু আন্দোলনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও (২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাপ্তির খাতা আজও শূন্য।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাসুদ রানা এই হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ত্যাগের দিক থেকে জবি অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ, হামলার বিচার এবং শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা চরম বঞ্চনার শিকার।
নিচে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা এবং বর্তমান আক্ষেপের চিত্রটি তুলে ধরা হলো
আন্দোলনের সূচনা ও পুরান ঢাকার ফ্রন্টলাইন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীর মানববন্ধনের মাধ্যমে যে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তীতে দাবানলে রূপ নেয়।
২-৪ জুলাই ক্যাম্পাসে মিছিলের পর ৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁতীবাজার মোড়ে অবস্থান নেন।
৮ জুলাই গুলিস্তান মোড় এবং সচিবালয়ের সামনের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা।
১১ জুলাই শাহবাগের কেন্দ্রীয় আন্দোলনে যুক্ত হয় জবি। এ সময় আন্দোলন সুসংগঠিত করতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ‘গোপন সমন্বয়ক দল’ গঠন করা হয়।
১৩-১৪ জুলাই তৎকালীন অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক (সাবেক উপদেষ্টা) আসিফ মাহমুদ জবিতে আসেন। পরদিন জবির নেতৃত্বে বঙ্গভবন অভিমুখে বিশাল এক মিছিল বের হয়।
পুরান ঢাকার দুর্গ নয়াবাজার, তাঁতীবাজার, সদরঘাট ও বাবুবাজার ব্রিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলো নিজেদের দখলে রেখেছিলেন জবির শিক্ষার্থীরা।
পুরান ঢাকার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা ফ্রন্টলাইন যোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা অপেক্ষা করতাম, কখন জবি থেকে বড় মিছিল আসবে।
রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ছাত্রীদের দুঃসাহসিক যোগদান
১৫ জুলাই দিবাগত রাতে ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে আন্দোলনে যোগ দেন, যা এই আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হন জবি শিক্ষার্থীরা।
১৬ জুলাই (প্রতিরোধ ও গুলিবিদ্ধ) শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ঢাকার সিএমএম আদালতের সামনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলিতে নাসিমসহ অন্তত চারজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন।
১৮-১৯ জুলাই পুলিশ ৫ জন শিক্ষার্থী ও সমন্বয়ক নুরুন্নবীকে গ্রেফতার করে। ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর লক্ষ্মীবাজারে পুলিশের গুলিতে অন্তত সাতজন নিহত হন, যা পুরান ঢাকার মানুষের কাছে আজও এক বিভীষিকাময় স্মৃতি।
৫ আগস্ট (চূড়ান্ত বিজয়) বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ৪ আগস্ট ক্যাম্পাসে কর্মসূচির চেষ্টা এবং ৫ আগস্ট ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গণভবন অভিমুখে ছুটে যান জবির শিক্ষার্থীরা।
ত্যাগের বিপরীতে শূন্য প্রাপ্তি ও ক্ষোভ
আন্দোলনে জবির শিক্ষার্থীরা বিপুল ত্যাগ স্বীকার করলেও, মাসুদ রানার মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি।
‘মায়া কান্না’ ও দুর্নীতির অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বঞ্চনার কথা স্বীকার করলেও, মাসুদ রানা এটিকে ‘মায়া কান্না’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সহানুভূতির বদলে সরকারের উচিত ছিল বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি তিনি বর্তমান সরকারের কিছু উপদেষ্টার সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি জানান। তার মতে, একসময় যারা নিঃস্ব ছিলেন, তারা এখন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন— যা অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যের পরিপন্থি।
শিক্ষার্থীদের বর্তমান দাবি ও প্রত্যাশা
বিগত সরকারের আমল থেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘সৎমায়ের আচরণের’ শিকার। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো হলো
দ্রুততম সময়ে আবাসন সংকট নিরসনে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দিতে হবে, যেন আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে তা ব্যবহার উপযোগী হয়।
২০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একটি মানসম্মত ও আধুনিক ক্যান্টিন, নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন এবং পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টার নির্মাণ করতে হবে।
১৬ জুলাই ও তৎপরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী এবং ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দৃশ্যমান বিচার করতে হবে।
১৯ জুলাই লক্ষ্মীবাজার ও ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় নিহত শহিদদের স্মরণে অবিলম্বে একটি স্থায়ী ‘জুলাই স্তম্ভ’ নির্মাণ করতে হবে।
সব মত ও আদর্শের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় গঠিত বর্তমান সরকার অতীতের বৈষম্যমূলক মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার বুঝিয়ে দেবে— এমনটাই প্রত্যাশা জবিয়ানদের।
সময়ের আলো/জোই